খবর:
বৃষ্টির দিনে হেডফোন কানে দিয়ে রিকশায় বসে আছেন। মনে হচ্ছে, কোনো সিনেমার দৃশ্য চলছে। কিংবা হঠাৎ ক্যাফেতে একা বসে কফি খেতে খেতে মনে হলো, ‘এই মুহূর্তটা যেন সিনেমার মতো’। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখন এমন অনুভূতির জন্য একটি শব্দ খুব জনপ্রিয়—‘মেইন ক্যারেক্টার সিনড্রোম’। (https://bangla.thedailystar.net/life-living/relation-family/news-3927151)
মন্তব্য:
আজকের তরুণরা যখন তাদের চারপাশের বাস্তব জগৎকে ধূসর, অর্থহীন ও নিষ্প্রভ মনে করতে শুরু করে, তখনই সোশ্যাল মিডিয়ার সাজানো “অ্যাসথেটিক” জগৎ তাদের নিজেদের জীবনের একচ্ছত্র ‘নায়ক’ বা Main Character হওয়ার প্রলোভন দেখায়। ট্রেন্ডিং ফিল্টার, নির্দিষ্ট ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক বা 'POV' ট্রেন্ড ব্যবহার করে তারা মুহূর্তের জন্য এক কৃত্রিম আত্মতৃপ্তি ও মানসিক শান্তি অনুভব করে—যেন তাদের ভেতরের সব শূন্যতা দূর হয়েছে। এই ‘Main Character Energy’ নামক বিভ্রম তাদের ধাক্কা দেয় এক গভীর ফাঁদে। নিজেদের নায়ক ভাবতে চাওয়া তরুণরা ধীরে ধীরে পরিণত হয় সেক্যুলার পপ-কালচার ও সোশ্যাল মিডিয়া অ্যালগরিদমের নিছক 'Props' বা উপকরণে। তাদের প্রতিটি পছন্দ-অপছন্দ, পোশাক-আচার, এমনকি চিন্তাভাবনাও বৈশ্বিক ট্রেন্ডের অন্ধ অনুকরণে পরিণত হয়। তাদের কোনো সত্যিকারের ‘True Identity’ গড়ে উঠতে দেওয়া হয় না; তারা হয়ে ওঠে এক প্রেডিক্টেবল ‘NPC’ (Non-Playable Character) — যাদের প্রতিটি পদক্ষেপ আগেই অ্যালগরিদমের টেবিলে লিখা ছিল।
সমাজ থেকে স্রষ্টার কর্তৃত্বকে অস্বীকার করা পশ্চিমা ধর্মনিরপেক্ষ জীবন ব্যবস্থায় তরুণদের আচরণ গঠিত হয় কয়েকটি ধারণার মাধ্যমে। এর মধ্যে Individualism তাদের শেখায় যে শুধু নিজের সুখ-স্বার্থই সবকিছুর উর্ধ্বে। Aesthetic Culture তাদের বাস্তবতাকে ফিল্টার করা ছবির মতো সাজানোর অভ্যাস করায়। অ্যালগরিদমের Echo Chamber তাদের একই ধরনের কন্টেন্টের ভেতর আটকে ফেলে। FOMO (Fear of Missing Out) তাদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্ক্রলে বেঁধে রাখে। আর Validation Trap-এ পড়ে তারা লাইক-কমেন্টের কৃত্রিম স্বীকৃতিকেই নিজেদের অস্তিত্বের প্রমাণ ভাবে। এই ধারণাগুলো মিলে তরুণদের ভেতরে তৈরি করে এক চরম Frustration ও Existential Vacuum — তারা একদিন বুঝতে পারে, তাদের কাঙ্খিত ‘Main Character’ হওয়ার স্বপ্ন কখনো পূর্ণ হয়নি; বরং তারা পরিণত হয়েছে এক অন্ধ অনুকরণকারীতে। তখন হতাশা তাদের গ্রাস করে।
এভাবে পশ্চিমা ধর্মনিরপেক্ষ জীবনদর্শন প্রথমে তরুণদের মনে এক ধরণের হীনম্মন্যতা ও বিষণ্ণতা তৈরি করে এবং পরে সেই বিষণ্ণতা কাটানোর বাহানা হিসেবে স্টারবাকসের কফি, দামি আইফোন বা লাক্সারি লাইফস্টাইলের ব্র্যান্ডিং করে তরুণদের একটি মেকি জগত ও কর্পোরেট পণ্যের দাসে পরিণত করে; যেখানে বনানীর ক্যাফেতে আইসড লাতের পাশে ম্যাকবুক সাজিয়ে রিলস বানানো কিংবা নিউইয়র্কের কফি শপে ট্রেন্চ কোট জড়িয়ে “Dark Academia” রিল তৈরি করে নিজেকে “Main Character” ভাবার অলীক সান্ত্বনা দেওয়া হয়। এই পুরো চক্রটি আসলে মানুষকে তার নফসের দাসে (Slavery of our Desires) পরিণত করে, যেখানে মানুষ কেবল নিজের সস্তা চাওয়া-পাওয়া আর লাইক-ভিউয়ের “External Validation Trap”-এ বন্দি হয়ে পড়ে।
এর বিপরীতে, ইসলামী জীবনাদর্শ তরুণদের একা একা স্বার্থপর সেলিব্রেটি বা গ্লোবাল অ্যালগরিদমের খাঁচায় বন্দি কোনো “NPC” হতে শেখায় না, বরং সৃষ্টিকর্তার দাসত্ব (Slavery of Allah) গ্রহণের এক পরম মানসিক প্রশান্তি দেয় এবং আলী (রা.) বা উসামা বিন যায়েদ (রা.)-এর মতো ইসলামের ইতিহাসের সাহসী তরুণদের উদাহরণ সামনে রেখে তরুন জেনারেশনকে ‘উম্মাহ্’র পাহারাদার’ হিসেবে গড়ে তোলে। যখন একজন তরুণ নিজেকে কেবল আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তাআ'লার দাস হিসেবে চিনে তখন সে একটি বৃহৎ উম্মাহ্’র অর্থপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে এবং এই সেক্যুলার পুঁজিবাদের অলীক আয়না ভেঙে চুরমার করে এক শাশ্বত ও মর্যাদাপূর্ণ ইসলামি সমাজ বিনির্মাণ করে মানবজাতিকে জুলুম থেকে ইসলামের রাষ্ট্র ব্যাবস্থার অধীনে শান্তির ছায়াতলে নিয়ে আসাই তার লক্ষ্য হয়ে ওঠে।
- আবু ইউসুফ
