আদ-দ্বীন ট্র্যাজেডির পর প্রশ্নের মুখে রাজধানীর বহু বেসরকারি হাসপাতাল



খবর:

তিন বছর ধরে ফায়ার লাইসেন্স ছাড়াই চলছে আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল। সরকার ও প্রশাসনের তৎপরতায় জানা গেছে, হাসপাতালটিতে মানা হয়নি বিল্ডিং কোড ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে দেয়া হতো চিকিৎসা সেবা। আদ-দ্বীন ট্র্যাজেডির পর নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যসেবার মান নিয়ে প্রশ্নের মুখে এখন রাজধানীর বেশিরভাগ বেসরকারি হাসপাতাল। (https://www.somoynews.tv/news/2026-06-02/NHRTwMG9)

মন্তব্য:

১৯৮২ সালের Medical Practice and Private Clinics and Laboratories (Regulation) Ordinance এর হাত ধরে বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিকভাবে আইনি কাঠামোর মধ্য দিয়ে বেসরকারি হাসপাতালের যাত্রা শুরু। সরকারের অদক্ষতা, অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি ইত্যাদি নানা সমস্যাকে কারণ হিসেবে দেখিয়ে যেভাবে আরো বিভিন্ন খাতকে বেসরকারিকরণে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে, স্বাস্থ্যখাতও তার মধ্যে একটি। গত ২০ বছর ধরে স্বাস্থ্যখাতে সরকারি বরাদ্দ জিডিপি ১ শতাংশেরও কম।[Centre for Policy Dialogue (CPD), “A Quick Look on Bangladesh Health Budget”, এপ্রিল ২০২৫] ফলে বর্তমানে বাংলাদেশে সরকারি হাসপাতালের সংখ্যা ৬৬০ টি এবং বেসরকারি হাসপাতালের সংখ্যা ৬০৪৭ টি। [Directorate General of Health Services (DGHS), উদ্ধৃত The Business Standard, মার্চ ২০২৪।] কিন্তু সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তির গল্পটা দিনকে দিন করুণ থেকে করুণতর হচ্ছে। একদিকে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে তার আর্থিক অবস্থানের ভয়াবহ অবনমন ঘটছে। অন্যদিকে, স্বাস্থ্যসেবা হিসেবে তাকে গুনতে হচ্ছে গভীর রাত পর্যন্ত অপেক্ষার প্রহর, একশর বেশি রোগী দেখা ডাক্তারের বিরক্তি, একদিনে ৬৭টি এন্ডোস্কপি করা ডাক্তারের হাতে রোগীর অপমৃত্যু, ভেন্টিলেশন ছাড়া এসিরুমে শিশুর অপমৃত্যু, নোংরা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, ফায়ার এক্সিটহীন ভবন ইত্যাদি। অর্থাৎ, সেই অদক্ষতা, অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি যা আগে সরকারি হাসপাতালে ফ্রিতে পাওয়া যেত তা এখন কিনে নেয়া লাগছে। 

প্রশ্ন চলে আসে- শিল্প, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ব্যাংক ইত্যাদি খাতের সমস্যাগুলোর সমাধানের চেষ্টা না করে কেন ঢালাওভাবে বেসরকারিকরণের পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে? এটা কি কোন খামখেয়ালী চিন্তা নাকি এখানে কোন ভিত্তিমূলক চিন্তার প্রতিফলন ঘটেছে? ইউরোপীয় এনলাইটেনমেন্ট সময়ের ধর্মনিরপেক্ষ চিন্তাবিদ জন লক এর মত দার্শনিকরা ব্যক্তি মানুষের স্বাধীনতাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে। বেশ কয়েকটা স্বাধীনতার মধ্যে একটি হচ্ছে “মালিকানার স্বাধীনতা”। ব্যক্তি মানুষ চাইলে যেকোন কিছুর মালিক হতে পারবে। রাষ্ট্রের কাজ সেই অধিকার রক্ষা করা, বাধা দেওয়া নয়। এই দৃষ্টিতে রাষ্ট্রীয় মালিকানা ব্যক্তির মালিকানার স্বাধীনতার পথে এক বাধা। লকের এই চিন্তার উপর ভিত্তি করেই গড়ে ওঠে নব্য উদারতাবাদ বা নিওলিবারেলিজম। অর্থাৎ রাষ্ট্রকে ব্যক্তির মালিকানা নিশ্চিতের জন্য উদার হয়ে পলিসি তৈরি করতে হবে। পরবর্তীতে হায়েক ও ফ্রিডম্যানের মতো অর্থনীতিবিদদের হাত ধরে আইএমএফ, ওয়ার্ল্ড ব্যাংক এবং মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ এর মাধ্যমে আশির দশকে এই চিন্তা একটি নির্দিষ্ট নীতিমালার রূপ নেয়, যা ‘ওয়াশিংটন কনসেনসাস’ নামে পরিচিত: যেকোনো সমস্যার একটাই সমাধান — বেসরকারিকরণ, বাজার উন্মুক্তকরণ, রাষ্ট্রের হাত গুটিয়ে নেওয়া। কিন্তু এই সমাধানে সাধারণ মানুষের জীবনের সমস্যা মেটে না। কারণ ব্যক্তির স্বাধীনতা বলতে মূলতঃ ধণী ব্যক্তির স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে গিয়ে এই চিন্তা সাধারণ মানুষের চিকিৎসার মত মৌলিক সেবা পাওয়ার অধিকার কেড়ে নিচ্ছে। যেমন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত না করেও যদি মুনাফা নিশ্চিত করা যায়, তাহলে ব্যক্তি তো আর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে বাধ্য না।

ইউরোপীয় এনলাইটেনমেন্ট এর সময়েই পাশেই আরেকটি আদর্শ সাফল্যের সাথে পথ চলছিল-তা হল ইসলাম। ইসলামি শাসনব্যবস্থা  খিলাফত পরিচালিত হচ্ছিল মহান রাব্বুল আলামিন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র দেখানো সীমারেখার মধ্যে। রাষ্ট্রর দায়িত্ব ছিল সেই সীমারেখার মধ্যে থেকে প্রত্যেক নাগরিকের মৌলিক চাহিদা রক্ষার জন্য পলিসি বানানো। তাই মানুষ কিসের মালিক হতে পারবে, আর কিসের মালিক হতে পারবে না তা নির্ধারিত ছিল। যেমন খিলাফত রাষ্ট্রে বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা খলিফার উপর বাধ্যতামূলক ছিল। কারণ এটা মানুষের মৌলিক চাহিদা, ব্যবসায়িক পণ্য না। একটা রাষ্ট্রীয় হাসপাতাল নির্মাণের ক্ষেত্রে প্রখ্যাত চিকিৎসক আল রাজি যে পদ্ধতি ব্যবহার করেছিলেন তাও প্রমাণ করে যে খলিফা এবং তার সাথে আরো যারা দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন তারা জনমানুষের জন্য কতটা আন্তরিক ছিল। আল রাজি হাসপাতাল নির্মাণের আগে বাগদাদ শহরের বিভিন্ন প্রান্তে তাজা মাংসের টুকরা ঝুলিয়ে দেন এবং কয়েকদিন অপেক্ষা করেন। যেখানে সবচেয়ে দেরীতে মাংসতে পচন ধরে, সেই স্থানকেই হাসপাতাল নির্মাণের জন্য মনোনীত করেন। আল-রাজির যুক্তি ছিল — যত ধীরে পচন, তত পরিষ্কার বায়ু, তত স্বাস্থ্যকর পরিবেশ রোগীর সুস্থতার জন্য। নাগরিকদের কল্যাণের বিষয়টা এতটাই অগ্রাধিকার পেত তাদের যেকোন পলিসি তৈরিতে। 

    -    জাবির জোহান

Previous Post Next Post