খবর:
আইএমএফ-এর বসন্ত-সভার তৃতীয় দিন শেষে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, মূলধন সংকটে ভোগা রুগ্ন ব্যাংকগুলোকে বড় ধরনের ঋণ সহায়তা দিতে সম্মত হয়েছে ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশন (আইএফসি)। ঋণনির্ভর বিভিন্ন সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নেও পাশে থাকবে আইএফসি। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশের শেয়ারবাজারের কারসাজি রোধে পরামর্শ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দেবে আর্থিক লেনদেন প্রক্রিয়াকরণ প্রতিষ্ঠান জেপি মরগান। (https://www.amadershomoy.com/economics/article/183386/মূলধন-ঘাটতিতে-ভোগা-ব্যাং)
মন্তব্য:
আইএফসি (ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশন) হল বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রাইভেট সেক্টর প্রতিনিধি যার মূল কাজ হল আর্থিক সংকটে থাকা দেশগুলোতে আর্থিক খাতের ঝুঁকি ও প্রাথমিক লোকসানকে হজম (cushioning) করে জেপি মরগানের মত ধুরন্ধর প্রাইভেট ইনভেস্টরদের জন্য বাজারকে উন্মুক্ত ও লাভজনক করা। অর্থাৎ, জেপি মরগান যে দেশে প্রবেশ করতে চায় বা কার্যক্রম বিস্তৃত করতে চায় সে দেশের আর্থিক খাতকে তার জন্য ঝুঁকিমুক্ত করার দায়িত্ব নেয় আইএফসি, এবং বিনিময়ে আইএফসিকে অল্প সুদে মূলধন জোগাড় করে দেয় জেপি মরগান। আবার, এই দুটি প্রতিষ্ঠান হল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূ-রাজনৈতিক হাতিয়ার যার মাধ্যমে উত্তর আমেরিকা মহাদেশের এই আগ্রাসী দেশটি বিভিন্ন দেশের আর্থিক খাতে তার আধিপত্য বিস্তার করে ও ধরে রাখে। সাম্প্রতিক সময়ে জেপি মরগান আফ্রিকা ও এশিয়ার উদীয়মান অর্থনীতির বেশ কিছু দেশে আগ্রাসীভাবে প্রভাব বিস্তার করছে বলে অভিযোগ উঠেছে, যার মূল লক্ষ্য হচ্ছে চীনের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের বানিজ্যযুদ্ধের সাথে জড়িত বিভিন্ন নীতি বাস্তবায়নের টেকনিক্যাল ও লজিস্টিকস সহায়তা প্রদান করা।
আইএফসি কর্তৃক বাংলাদেশের দুর্বল ব্যাংকগুলোকে তহবিল সরবরাহের আগ্রহ প্রকাশ ব্যাংগুলোর জন্য স্বস্তির খবর নয়, বরং বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত, বৈদেশিক মুদ্রার নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক বানিজ্যের জন্য অশনীসংকেত। “আইএফসি—জেপি মরগান” গোষ্ঠীর আড়ালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের আর্থিক খাতের দু্র্বলতার সুযোগ নিয়ে তহবিল-সহায়তার নাম করে দেশের অর্থিক ও ব্যাংকিং খাতে নিয়ন্ত্রন ও প্রভাব বিস্তার করতে চায়। এই নিয়ন্ত্রনের পরের ধাপে বাংলাদেশের স্থানীয় ব্যবসায়ীদেরকে ঋনের শর্ত হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি অনুসরণ ও বৈদেশিক বানিজ্যে এলসি বা গ্যারান্টি সুবিধাকে নিয়ন্ত্রন করে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বানিজ্যকে নিয়ন্ত্রন করা হবে এবং রফতানি আয়ের বৈদেশিক মুদ্রার ব্যবহারকে সরাসরি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছাধীন করা হবে। তাছাড়া, জেপি মরগান ইতিমধ্যিই ঢাকা ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংক ও ইস্টার্ণ ব্যাংককে অংশীদার হিসেবে নিয়ে দেশের বিশাল রেমিটেন্স প্রবাহকে নিয়ন্ত্রন করার কার্যক্রম শুরু করেছে, যা বহাল থাকলে দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার আন্ত:প্রবাহে তাদের একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা হবে।
আরো ভয়ানক খবর হল: এই মার্কিন গোষ্ঠীটি বাংলাদেশের সরকারি ও গণমালিকানাধীন বিভিন্ন অবকাঠামোকে Unlocking ও Securitization এর নামে খোলাবাজারের পন্যের মত বেচাকেনা করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এই প্রক্রিয়ায় পদ্মা সেতু, যমুনা সেতু, এলিভেটেড এক্সপ্রেস-ওয়ে, রেলপথ ও ম্রেট্রোরেলসহ জনসাধারনের কাছ থেকে টোল আদায়কারী বিভিন্ন আবকাঠামো ও স্থাপনাগুলোকে হস্তান্তরযোগ্য আর্থিক দলিল বা Security-তে রূপান্তর করে সেটা নিয়ে বিশাল আকারের আর্থিক কারসাজি ও ধান্ধা (Scheme/Scam) করা হতে পারে। একসল অবকাঠামো ও স্থাপনা নিয়ে Mortgage-Backed Security কিংবা Asset-Backed Security মডেলের মত জটিল Financial Instrument সৃষ্টি করা হলে ব্যাপক মূল্যস্ফিতি ও আর্থিক অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকা জনগণের মধ্যে অবধারিতভাবে বিশাল আর্থিক বাবল (bubble) তৈরী হবে, যার মাধ্যমে দেশের সাধারণ জনগণ এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি বিনিয়োগকারীরা সর্বশান্ত হবে। সুতরাং, যারা বাংলাদেশের আর্থিক খাতে মার্কিন আগ্রাসনকে সুখবর ও স্বস্তির বার্তা হিসেবে উল্লেখ করছে তারা নি:সন্দেহে জাতির সাথে গভীর প্রতারণা ও বিশ্বাসঘাতকতায় জড়িত।
- রিসাত আহমেদ
