বিএনপি–জামায়াতের মত নিয়েই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি হয়েছিল: সাবেক উপদেষ্টা ফরিদা



খবর:

বিএনপি–জামায়াতসহ রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত নিয়েই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তিনদিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের বাণিজ্যচুক্তি হয়েছিল বলে জানিয়েছেন ওই সরকারের মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার। (https://www.ittefaq.com.bd/788552/বিএনপি–জামায়াতের-মত-নিয়েই-যুক্তরাষ্ট্রের-সঙ্গে

মন্তব্য:

“মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাংলাদেশের বাণিজ্য চুক্তি” বিষয়টা বাংলাদেশের রাজনৈতিক এবং নীতিনির্ধারণী মহলে এমন এক অস্বস্তিকর এবং বিব্রতকর বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, এই “গলার কাঁটা”কে তারা না পারছে গিলতে, না পারছে ফেলতে। একদিকে বর্তমান সরকার পুরো বিষয়টাকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ঘাড়ে চাপিয়ে দিতে চাচ্ছে। আবার অন্যদিকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দুই সাবেক উপদেষ্টা দুই দফায় বক্তব্য দিয়েছেন যে, এই চুক্তি যাকে সবাই “দাসত্বমূলক”, “ভয়াবহ নতজানু” বলছে তা সরকার ও বিরোধীদলীয় জোটের প্রায় সকল রাজনৈতিক দলের সম্মতি নিয়েই করা হয়েছে। সেই দলগুলোরও এই ভয়াবহ দাসখতমূলক চুক্তির বিষয়ে তাদের অবগত থাকাটা অস্বীকারও করছে না, আবার এই চুক্তি বাংলাদেশের জন্য যে “দারুণ” কিছু তাও বলতে পারছে না। অনেকটা আমতা আমতা করে পর্যালোচনার কথা সরকারপক্ষ, বিরোধী দল এবং তাদের পক্ষের সুশীল ব্যক্তিবর্গরা আলোচনায় আনলেও এই বিষয়ে প্রত্যেকে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে একমত যে এই চুক্তিটি প্রায় শতভাগ বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী। 

এখান থেকে আমাদের একটা ইতিবাচক শিক্ষা নেয়ার প্রয়োজন আছে। যেখানে বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারসহ বর্তমান সরকার, বিরোধী দলসহ প্রায় বাকিসব রাজনৈতিক দল আমেরিকার সাথে দেশের এই দাসখতের ব্যাপারে একমত। তারপরেও তারা শুধুমাত্র জনরোষের আশংকায় চুক্তিটি বাস্তবায়নের ব্যাপারে ধীরগতিতে এগুচ্ছে। সাধারণ সচেতন জনগণ অনলাইন-অফলাইনে নিজ নিজ জায়গা থেকে তাদের তীব্র আপত্তি সমাজে ছড়িয়ে দিয়েছে। তারা প্রশ্ন করেছে- চুক্তির নথিতে বাংলাদেশের জন্য ১৩১ বার বাধ্যবাধকতা (“Bangladesh shall”) আর যুক্তরাষ্ট্রের জন্য মাত্র ৬ বার (“USA shall”) কেন? এটি কি একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের সমমর্যাদার দ্বিপাক্ষিক চুক্তি, নাকি একতরফা শর্ত চাপিয়ে দেওয়া (Asymmetric Agreement)? এই চুক্তির কোনো খসড়া বা শর্ত সই করার আগে কেন জাতীয় সংসদে কিংবা কোনো পাবলিক ফোরামে প্রকাশ করা হলো না? দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণী একটি চুক্তি কেন সম্পূর্ণ গোপন রাখা হলো? মার্কিন কৃষিপণ্যে শুল্ক ছাড় দিলে যদি আমাদের বাজার সস্তা আমদানিকৃত গমে সয়লাব হয়ে যায়, তবে দেশীয় ধান ও গম চাষিরা কি চাষাবাদ ছেড়ে দিতে বাধ্য হবে না? এটি কি দীর্ঘমেয়াদে আমাদের খাদ্য স্বয়ংসম্পূর্ণতা (Food Security) ধ্বংস করে পুরোপুরি মার্কিন আমদানির ওপর নির্ভরশীল করে তুলবে না? তৈরি পোশাক খাতে মাত্র ১% শুল্ক ছাড় পাওয়ার জন্য আমরা কি আমাদের পুরো দেশের বাজার আমেরিকার জন্য উন্মুক্ত করে দিলাম? ১% শুল্ক ছাড়ের অর্থনৈতিক মূল্যের চেয়ে আমাদের দেওয়া ছাড়ের মূল্য কি অনেক বেশি নয়? যদি যুক্তরাষ্ট্র পরবর্তী সময়ে অন্য কোনো রাজনৈতিক অজুহাতে এই ১% সুবিধা প্রত্যাহার করে নেয় বা নতুন নিষেধাজ্ঞা দেয়, তখন কি বাংলাদেশ এক ফাঁদে আটকে যাবে না? চুক্তির শর্ত অনুযায়ী যদি মার্কিন টেক জায়ান্টদের (Google, Amazon, Meta) উপর বাংলাদেশ কোনো ডিজিটাল ট্যাক্স বা শুল্ক আরোপ করতে না পারে, তবে আমাদের উদীয়মান দেশীয় আইটি খাত কীভাবে বিকশিত হবে? ইত্যাদি।

এরকম অসংখ্য প্রশ্নে সাধারণ সচেতন মানুষ চায়ের আড্ডায় কিংবা ফেইসবুকের নিউজফিডে ঝড় তুলেছে। এই তীব্র প্রতিক্রিয়া সাংবাদিকদের বাধ্য করেছে সাধারণ মানুষের এই তীব্র অপছন্দকে মেইনস্ট্রিমে তুলে ধরতে। এতে করে একটা অন্যায়কারী অত্যাচারী পরাশক্তির প্রতি যাদের তীব্র আনুগত্যবোধ আছে, তারাও সাধারণ মানুষের চোখে চোখ রেখে কথা বলতে ইতস্তত করছে। যা প্রমাণ করে “অন্যায়ের প্রতিবাদে কিছু হয় না”-যারা এই ন্যারেটিভটা দেয়, তা ভুল।

মুসলিম হিসেবে আমাদের জানা উচিত, ইসলাম “সৎ কাজের আদেশ এবং অসৎ কাজে নিষেধ”-কে কোন ঐচ্ছিক বিষয় হিসেবে নির্ধারণ করেনি। বরং এটিকে ফরয বা আবশ্যক হিসেবে নির্ধারণ করেছে। যেকোন অবস্থায় যেকোন পরিস্থিতিতে এই ফরয কাজকে নামায ও সিয়ামের মত পালন করে যেতে হবে। এভাবেই রাসূলুল্লাহ্‌ (সাঃ) ভয়াবহ বৈরী পরিবেশেও এই দায়িত্ব পালন করেছেন। রাষ্ট্রক্ষমতা পাওয়ার আগেও তিনি (সাঃ) যেমন “আমর বিল মারুফ নাহি আনিল মুনকার” প্রতিষ্ঠার কাজে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন, ঠিক তেমনি রাষ্ট্রক্ষমতা পেয়ে তিনি (সাঃ) সবচেয়ে বড় মুনকার অর্থাৎ তৎকালীন মানবরচিত জীবনবিধানকে নিষিদ্ধ করেন এবং তদস্থলে আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা প্রদত্ত বিধানকে রাষ্ট্রের সংবিধান ও বিধি-বিধানসমূহে প্রতিষ্ঠা করেন। “তোমরাই হলে সর্বোত্তম উম্মত, মানবজাতির কল্যাণের জন্য যাদের উদ্ভব ঘটানো হয়েছে। (কারণ) তোমরা সৎকাজের নির্দেশ দাও, অসৎকাজ থেকে নিষেধ করো এবং আল্লাহ্‌’র প্রতি ঈমান রাখো” (সূরা আলি ইমরান: ১১০)

    -    জাবির জোহান

Previous Post Next Post