এলডিসি উত্তরণের চাপে ওষুধ শিল্প: গবেষণায় বিনিয়োগ না বাড়ালে টিকতে কঠিন হবে দামের প্রতিযোগিতায়



খবর: 

স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, বর্তমানের পেটেন্ট ছাড় সুবিধা শেষ হলে আন্তর্জাতিক কোম্পানির লাইসেন্স ছাড়া অনেক ওষুধ উৎপাদন করা সম্ভব হবে না। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে, বেড়ে যেতে পারে ওষুধের দামও। (https://samakal.com/bangladesh/article/351872/এলডিসি-উত্তরণের-পর-চাপে-পড়তে-পারে-ওষুধ-শিল্প-গবেষণায়-বিনিয়োগ-বাড়ানোর-তাগিদ)

মন্তব্য:

বাংলাদেশ তার চাহিদার ৯৮ শতাংশ ওষুধ নিজ দেশে উৎপাদন করে। কিন্তু বাংলাদেশ নিজস্বভাবে কোনো নতুন ওষুধ আবিষ্কার করে না। মূলত স্বল্পোন্নত দেশ (LDC) হওয়ায় বাংলাদেশ অন্যান্য দেশের আবিষ্কৃত ওষুধ কপি করে উৎপাদন করতে পারে। কিন্তু স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বের হয়ে গেলে বাংলাদেশ আর এই সুবিধা পাবে না। তখন পেটেন্টকৃত ওষুধের কাঁচামাল বাংলাদেশ চাইলেও সহজে আমদানি বা দেশে উৎপাদন করতে পারবে না। ওষুধ শিল্পের এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য গবেষণা ও শিল্পখাতে ব্যয় বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এ ধরনের কথা আগেও বলা হলেও সেগুলো মূলত কথার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। যেমন, ওষুধের অ্যাকটিভ ইনগ্রেডিয়েন্ট (API) উৎপাদনের জন্য ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের জায়গা বরাদ্দ দেওয়া হলেও তা এখনও পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। ফলে এখনও অধিকাংশ কাঁচামাল আমদানি করতে হচ্ছে। এখানে মালিকপক্ষ ও সরকার একে অপরকে দোষারোপ করছে।

অন্যদিকে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কিছু প্রথাগত গবেষণা হলেও সেখানে শিক্ষার্থীদের মূল লক্ষ্য থাকে গবেষণাপত্র প্রকাশ করে বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্কলারশিপ পাওয়া, আর শিক্ষকদের লক্ষ্য থাকে পদোন্নতি। ফলে বাস্তবমুখী ও কার্যকর গবেষণা খুব কমই হচ্ছে।

তাই গবেষণায় বরাদ্দ বা বিনিয়োগ বাড়ানোর আগে আমাদের ভাবা উচিত - আমরা কেন এটি করতে চাই?

আমরা কেন শিল্পকে বহুমুখী করতে চাই বা গবেষণায় অগ্রসর হতে চাই? যদি আমাদের উদ্দেশ্য হয় বর্তমান বৈশ্বিক ব্যবস্থার কাঠামোর মধ্যেই থেকে এসব করা, তাহলে এর কাঙ্ক্ষিত ফলাফল আসবে না; বরং একপক্ষ আরেকপক্ষকে দোষারোপ করবে। কারণ শিল্পকারখানার মালিকপক্ষ চাইবে বাংলাদেশ যেন LDC অবস্থাতেই থাকে, যাতে তারা স্বল্পমূল্যে চীন থেকে কাঁচামাল এনে এখানে ওষুধ উৎপাদন করে লাভবান হতে পারে। আবার গবেষণায় যুক্ত শিক্ষার্থীরা চাইবে পশ্চিমা বিশ্বে গিয়ে সেখানেই তাদের পরবর্তী গবেষণা চালিয়ে যেতে। বর্তমান বৈশ্বিক কাঠামো এভাবেই গড়ে উঠেছে। ১৮ মার্চ আমেরিকান ডায়নামিজম সামিটে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলে: “The idea of globalization was that rich countries would move further up the value chain while the poor countries made the simpler things.” সুতরাং এই বিশ্বব্যবস্থার মোড়লরা যেহেতু চায় হায়ার ভ্যালু চেইন এর জিনিস তারা করবে, সুতরাং যেকোনমূল্যেই তারা এটি নিশ্চিত করতে চাইবে। তাই আমরা যদি এই রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যেই স্বনির্ভর হওয়ার স্বপ্ন দেখি, তাহলে তা বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত কঠিন।

আমাদের অবশ্যই এমন একটি নতুন রাজনৈতিক কাঠামোর অধীনে যেতে হবে, যেখানে আমরা স্বাধীন ও স্বনির্ভর রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে পারব। ইসলামের যে রাজনৈতিক ও আধ্যাত্মিক শক্তি রয়েছে, তার মাধ্যমে তথা খিলাফত ব্যবস্থার মাধ্যমে আমরা বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে রাজনৈতিকভাবে ঐক্যবদ্ধ করতে পারব। ইতিহাসের সোনালী অধ্যায় আমাদের সামনেই রয়েছে। ইউরোপ যখন মধ্যযুগের অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিল, তখন আব্বাসীয় খিলাফতের অধীনে বাগদাদের মতো আধুনিক নগরী গড়ে উঠেছিল। দারুল হিকমাহ-তে গবেষণা পরিচালিত হয়েছে। খিলাফতের পৃষ্ঠপোষকতায় ইবনে সিনা (চিকিৎসাবিজ্ঞান), মূসা আল-খাওয়ারিজমি (বীজগণিত), জাবির ইবনে হাইয়ান (রসায়ন), ইবনে আল-হাইসাম (অপটিক্স), আল-রাজি (চিকিৎসাবিজ্ঞান)সহ অসংখ্য বিজ্ঞানী গবেষণা করেছেন, যাদের আবিষ্কার আজও আধুনিক বিজ্ঞানের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

সুতরাং শুধু গবেষণায় বরাদ্দ বৃদ্ধি বা শিল্পকে বহুমুখী করার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো-আমরা কোন ব্যবস্থার অধীনে থেকে এটি করতে চাই এবং কেন করতে চাই। আমরা যদি আল্লাহ্‌’র দ্বীনের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ হয়ে খিলাফতে রাশিদাহ্‌’র আদর্শ অনুসরণ করি, তাহলে অবশ্যই সফল হতে পারব, ইনশা’আল্লাহ্‌। “আর যদি জনপদের অধিবাসীরা ঈমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত, তবে অবশ্যই আমি তাদের জন্য আসমান ও জমিনের বরকতসমূহ খুলে দিতাম…” (সূরা আল-আরাফ : ৯৬)।

    -    শায়হান কবির

Previous Post Next Post