খবর:
দেশে পণ্য উৎপাদন বাড়িয়ে কর্মসংস্থান সুরক্ষা এবং চলমান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মধ্যে রপ্তানি খাতকে সহায়তার লক্ষ্যে, বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানাগুলো ফের চালু করতে ৪০ হাজার কোটি টাকার একটি বিশাল পুনঃঅর্থায়ন (রিফাইন্যান্স) স্কিম চালু করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। (https://www.tbsnews.net/bangla/Economy/news-details-486301)
মন্তব্য:
বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানা চালু করে কর্মসংস্থান বাঁচানো, রপ্তানি সক্ষমতা ধরে রাখা এবং অর্থনীতিতে আস্থা ফেরানো-এসবই ৪০ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন স্কিমের ঘোষিত উদ্দেশ্য। এই বিপুল অংকের টাকাকে অনেকেই হাসিনা রেজিমের সময় ক্ষতিগ্রস্থ বর্তমান সরকারের ঘনিষ্ঠদের জন্য স্পেশাল বেইল আউট প্যাকেজ বলছে। রাজনৈতিক দিক বিবেচনায় না নিয়ে শুধু অর্থনৈতিক দিক বিবেচনা করলেও কি বলা যায় যে, এই উদ্যোগ শিল্পখাতকে দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ করবে? অর্থনীতিবিদদের একটি অংশ ইতিমধ্যে সতর্ক করেছেন যে, বিপুল অঙ্কের নতুন অর্থ সরবরাহ মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়াতে পারে। তবে আরও গভীর যে সংকটটি রয়েছে, সেটি হচ্ছে-এই স্কিম শিল্পখাতের “মূল সমস্যা” স্পর্শই করছে না।
যেসব কারণে কারখানাগুলো বন্ধ হয়েছে, সেগুলো অমীমাংসিত রেখে যদি নতুন ঋণ দেওয়া হয়, তাহলে তা কেবল বাজারে অসম প্রতিযোগিতা তৈরি করবে। কারণ, বর্তমানে যেসব কারখানা বিপুল জ্বালানি ব্যয়, ডলার সংকট, উচ্চ সুদহার ও কম দামের বৈশ্বিক ক্রয়াদেশের মধ্যেও টিকে থাকার চেষ্টা করছে, তাদের সামনে নতুনভাবে ভর্তুকিপ্রাপ্ত “দূর্বল” কারখানাগুলোকে দাঁড় করানো হবে। এতে দক্ষ ও শৃঙ্খলাপূর্ণ প্রতিষ্ঠানও ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের সংকট মূলত ব্যবসায়িক কাঠামোর সংকট। এই শিল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল হচ্ছে, তুলা, রাসায়নিক তন্তু- যার কোনোটির উপরই বাংলাদেশের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেই। আবার বাজারও নিয়ন্ত্রিত হয় বিদেশি ব্র্যান্ড ও বায়ারদের মাধ্যমে। তারা শুধু দামই নির্ধারণ করে না; শ্রম আইন, পরিবেশগত কমপ্লায়েন্স - সবকিছুর উপর কার্যত প্রভাব বিস্তার করে। ফলে বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা প্রকৃত অর্থে বাজার স্বাধীনতা ভোগ করেন না। উৎপাদন খরচ বাড়লেও তারা পণ্যের দাম বাড়াতে পারেন না।
এই ধরনের বেইলআউট না দিয়ে, বরং সরকারের উচিত সরাসরি সেসব খাতে বিনিয়োগ সহায়তা দেয়া, যেগুলো পোশাকশিল্পের কাঁচামালে বিদেশ নির্ভরতা কমাবে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের তুলা ও তুলাজাত পণ্যের আমদানি ব্যয় ৫ থেকে ৮ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে ঘোরাফেরা করেছে। অথচ আফ্রিকার তুলা উৎপাদনকারী দেশগুলোর সঙ্গে যৌথ চাষ, জিনিং, গুদামজাত ও সরবরাহ চেইনভিত্তিক অংশীদারত্ব গড়ে তোলার মতো কৌশলগত উদ্যোগ এর মাধ্যমে এই কাচামালে নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ বাড়ানো যেতে পারে। একইভাবে, বিশ্ব কৃত্রিম তন্তু নির্ভর পোশাকের বাজার বিশাল। সরকার যদি পেট্রোকেমিক্যালভিত্তিক সিনথেটিক ফাইবার, ফিলামেন্ট ও সুতা শিল্পে বড় বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি করে, তাহলে নতুন বাজার উন্মুক্ত হবে।
এছাড়া দেশের নিজস্ব কাঁচামাল- পাট ও চামড়ায় মূল্য সংযোজন বাড়ানোতে সহায়তা করা উচিত। পাটকে কটনাইজেশন প্রযুক্তির মাধ্যমে লিনেন বা হেম্পজাত উচ্চমূল্যের তন্তুতে রূপান্তর করা সম্ভব। এতে ১ ডলারের কাঁচা তন্তুর মূল্য ৩ থেকে ৭ ডলার পর্যন্ত উন্নীত হতে পারে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে বাজার বৈচিত্র্য। বৈশ্বিক ব্র্যান্ডনির্ভর পোশাকবাজার অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত ও প্রায় স্যাচুরেটেড। এখানে উৎপাদক সবসময় কোণঠাসা। বাংলাদেশের উচিত নন-ব্র্যান্ডেড ও আঞ্চলিক পোশাকবাজারে প্রবেশের কৌশল নেয়া। দক্ষিণ এশিয়া, আফ্রিকা কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যবিত্ত বাজারে নিজস্ব ব্র্যান্ড বা কমদামি মানসম্পন্ন পোশাকের বড় সুযোগ রয়েছে। অতএব, সমস্যার গোড়ায় না গিয়ে শুধু ঋণ ঢাললে শিল্পের অসুস্থতা আরও ছড়িয়ে পড়বে। বাংলাদেশের প্রয়োজন “বেইলআউট অর্থনীতি” নয়, বরং “কাঁচামাল ও বাজার নিয়ন্ত্রণভিত্তিক শিল্পনীতি”। এটি ইসলামি শিল্প ব্যবস্থাপনার অন্যতম নীতি। কারণ ইসলাম দেশের মানুষের সম্পদ ও শিল্পের উপর বিদেশীদের নিয়ন্ত্রণকে নিষিদ্ধ করে। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা বলেন, “…এবং কিছুতেই আল্লাহ্ মু’মিনদের উপর কাফিরদের কর্তৃত্বকে মেনে নেন না” (সূরা নিসা ১৪১)।
- মোহাম্মদ তালহা হোসেন
