বাংলাদেশ সীমান্তে ‘আরেক কাশ্মীর’ সৃষ্টির শঙ্কা



খবর:

ভারতের কলকাতাভিত্তিক অলাভজনক সংস্থা ‘শবর ইনস্টিটিউট’ ও ফ্যাক্ট-চেক সংস্থা ‘অল্ট নিউজ’-এর পরিসংখ্যান বলছে, এসআইআরের নামে পশ্চিমবঙ্গ থেকে প্রায় ৯২ লাখ মানুষের নাম চূড়ান্তভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে অথবা ‘আন্ডার অ্যাডজুডিকেশন’ (বিবেচনাধীন) তালিকায় ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, বাদ পড়া এ বিশাল জনগোষ্ঠীর ৬০ শতাংশই মুসলিম। এ পরিসংখ্যানিক বর্জনের সমান্তরালে মালদহ ও মুর্শিদাবাদে শুরু হয়েছে এক অঘোষিত মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ, যা কাশ্মীর উপত্যকার দমন-পীড়নের কথা মনে করিয়ে দেয়।  (https://www.dailyamardesh.com/national/amdvtoat8hacz)

মন্তব্য:

ওয়েস্টফেলিয়ান জাতিরাষ্ট্র ব্যবস্থা মূলত একটি ত্রুটিপূর্ণ ধারণা, কারণ এটি ধর্ম, বর্ণ ও জাতিগত বিভাজন দূর করে সকল মানুষকে সমানভাবে ঐক্যবদ্ধ করতে ব্যর্থ। ভারতের শাসক শ্রেণীর চলমান ইসলামবিদ্বেষী ও মুসলিম-বিরোধী কার্যকলাপই এর প্রমাণ।  ১৬৪৮ সালের ওয়েস্টফালিয়া শান্তিচুক্তির মাধ্যমে জাতিরাষ্ট্রের ধারণার সূচনা হলেও এটি বিশ্বে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক সংঘাত কমাতে পারেনি; বরং জাতীয়তাবাদ, জাতিগত শ্রেষ্ঠত্ববোধ ও বিভাজনকে উসকে দিয়েছে।  জাতি রাষ্ট্রগুলোতে একটা অপরিহার্য বাস্তবতা হচ্ছে সংখ্যাগরিষ্ঠরা কর্তৃত্ব ও আধিপত্য বিস্তার করে এবং সংখ্যালঘুরা জাতিগত সহিংসতা ও নির্মুলের শিকার হয়।   এই একই ঘৃণ্য জাতীয়তাবাদের মতাদর্শের ফলে ইহুদিবাদী ইসরাইল ফিলিস্তিনের পবিত্র ভূমিতে তাদের অবৈধ দখদ্বারিত্ব বজায় রেখেছে। উইঘুরে চীনের শাসকগোষ্ঠী দ্বারা মুসলিমরা নিপীড়িত হচ্ছে এবং মায়ানমারে বৌদ্ধ সন্ত্রাসীদের দ্বারা রোহিঙ্গা মুসলিমরা  গণহত্যার শিকার হচ্ছে। শুধুমাত্র মুসলিমরা নয়, বরং পূর্ব ইউরোপের জার্মান সংখ্যালঘুরা, ইউরোপে বসবাসরত জিপসিরা এবং খোদ আমেরিকায় বসবাসরত ন্যাটিভ আমেরিকানদের কেউই জাতিগত নির্মূল থেকে রেহাই পাচ্ছে না! উল্টো এশিয়া থেকে ইউরোপ হয়ে আমেরিকা পর্যন্ত, রাজনীতিবিদ ও রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতায় আসার জন্য জাতিরাষ্ট্রের অন্তর্নিহিত দুর্বলতা যেমন: “বিদেশী”, “বিদেশাতঙ্ক”, “অবৈধ অভিবাসী”, “রাষ্ট্রের শত্রু” ইত্যাদি ন্যারেটিভকে কাজে লাগাচ্ছে।

জাতি-রাষ্ট্রের সম্পূর্ণ বিপরীতে, ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে রাষ্ট্রের সকল নাগরিককে সমান বলে গণ্য করা হয়। ইসলাম জাতি ও গোত্রসমূহের পরিচিতিকে পরস্পরের মধ্যে বিভেদ নয়, বরং চিহ্নিত করার উপায় হিসেবে দেখে। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন, “হে মানুষ, আমি তোমাদেরকে এক নারী ও এক পুরুষ থেকে সৃষ্টি করেছি আর তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি। যাতে তোমরা পরস্পর পরিচিত হতে পার।তোমাদের মধ্যে আল্লাহ্’র কাছে সে ব্যক্তিই বেশী মর্যাদাসম্পন্ন যে তোমাদের মধ্যে বেশী তাকওয়াসম্পন্ন। নিশ্চয় আল্লাহ্ সর্বজ্ঞ, সম্যক অবহিত।” (সূরা হুজুরাত : ১৩)। কোনো জাতি অন্য জাতির চেয়ে শ্রেষ্ঠ নয়, কিংবা কোনো দেশ অন্য দেশের চেয়ে উন্নত নয়। কোনো আরব কোনো অনারবের চেয়ে শ্রেষ্ঠ নয়, শুধুমাত্র তার তাকওয়া এবং আল্লাহ্’র সুবহানাহু ওয়া তা’আলা ভয়ের কারণে ছাড়া। শাসন, বিচার বা জনকল্যাণের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের জন্য তার জনগণের মধ্যে বৈষম্য করা অনুমোদিত নয়। আফ্রিকা ও ইউরোপের মধ্যকার অভিন্ন ইতিহাসের গভীরে গেলে দেখা যায় যে আন্দালুসে মুসলিম বিজয় এবং তার পরবর্তী সমৃদ্ধি ও অন্তর্ভুক্তির যুগটি বর্তমান ওয়েস্টফেলিয়ান জাতি রাষ্ট্রের ট্র্যাজেডির সাথে এক সুস্পষ্ট বৈপরীত্য সৃষ্টি করে। ৪০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে, আইবেরীয় শহর টোলেডো, কর্ডোবা এবং গ্রানাডায় একটি জ্ঞান-ভিত্তিক অর্থনীতি বিকাশ লাভ করেছিল। ইহুদি, খ্রিস্টান এবং মুসলিমরা শান্তি ও সম্প্রীতিতে একসাথে বসবাস করত। শুরু থেকেই, ইসলামী সভ্যতা ছিল একটি সত্যিকারের সার্বজনীন সভ্যতা। এটি বিস্তারের সাথে সাথে পারস্য ও রোমান সাম্রাজ্যকে নিজের মধ্যে আত্মীভূত করে নেয়। এটি তাদের ইসলামী রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে একটি নতুন পরিচয় প্রদান করে। ইউরোপ, এশিয়া, মধ্য এশিয়া এবং আফ্রিকার স্থানীয় জনগোষ্ঠী সকলেই একটি একক সত্তায় একীভূত হয়ে যায়।  উসমানীয় খিলাফতের খ্যাতি এতটাই ছিল যে, স্পেন ও পর্তুগালের ইহুদিরা সেখানকার খ্রিস্টান Inquisitors দের হাত থেকে নিজেদের বাঁচাতে ইস্তাম্বুলে অভিবাসন করতে পছন্দ করত। 

    -    কাজী তাহসিন রশীদ 


Previous Post Next Post