খবর:
হাম ও হামের উপসর্গে গত ২৪ ঘণ্টায় (শুক্রবার সকাল ৮টা থেকে শনিবার সকাল ৮টা) দেশে আরও ৯ শিশু মারা গেছে। এর মধ্যে তিন শিশুর হাম শনাক্ত হয়েছিল। হামের উপসর্গ ছিল ৬ শিশুর। এ পর্যন্ত মোট ৩৫২টি শিশুর মৃত্যু হলো। এ সময়ে সারা দেশে আরও ৯৪৬ শিশুর শরীরে হামের উপসর্গ দেখা দেওয়ার তথ্য দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। আর গত ২৪ ঘণ্টায় ৪৮৯ শিশুর হাম শনাক্ত হয়েছে। অর্থাৎ, গত ২৪ ঘণ্টায় হাম ও হামের উপসর্গে আক্রান্ত হয়েছে ১ হাজার ৪৩৫ শিশু। (https://www.prothomalo.com/bangladesh/ej7tllnuo6)
মন্তব্য:
দেশে হামের পর্যাপ্ত টিকা মজুত থাকা সত্ত্বেও মৃত্যু ও সংক্রমণের এই আশঙ্কাজনক দ্রুত বৃদ্ধি মূলত স্বাস্থ্যখাতের দীর্ঘদিনের কাঠামোগত অবহেলা এবং মুনাফালোভী পুঁজিবাদী কর্পোরেশনগুলোর একচেটিয়া দাপটের এক ভয়াবহ চিত্র। স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. আব্দুস সবুর এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করেছেন যে, মাঠপর্যায়ে টিকা না থাকলেও কেন্দ্রীয় গুদামে তা পর্যাপ্ত ছিল; কিন্তু পরিবহনের জন্য সামান্য অর্থ বরাদ্দ না থাকায় মহাখালী থেকে টিকাগুলো জেলা বা উপজেলা পর্যায়ে পৌঁছায়নি (thedailycampus.com: 9/05/2026)। রোগ প্রতিরোধের প্রাথমিক ধাপেই যখন শিশুদের স্বাস্থ্য নিরাপত্তা এভাবে ধ্বংস করে দেওয়া হয়, তখন দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন এই শিশুরা সহজেই বিভিন্ন ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়াজনিত মরণব্যাধির শিকারে পরিণত হয়। যথাযথ মনিটরিংয়ে অভাবে শিশুদের শরীরে অতিমাত্রায় এবং অযৌক্তিক অ্যান্টিবায়োটিক নির্ভর চিকিৎসা পদ্ধতি চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (২০২৩) রিপোর্ট অনুযায়ী, বাংলাদেশে শিশুদের সাধারণ সংক্রমণের ৫৬% থেকে ৭০% ব্যাকটেরিয়া এখন শক্তিশালী অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তুলেছে। ল্যানসেট (The Lancet) জার্নালের গবেষণা সতর্ক করেছে যে, এই ‘অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স’ (AMR) এর ফলে জীবনরক্ষাকারী ওষুধগুলো কার্যকারিতা হারিয়ে সাধারণ ব্যাকটেরিয়াকে “সুপারবাগে” পরিণত করছে।
তাছাড়া, ইউনিসেফ (UNICEF) বা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-এর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো মুনাফাখোর বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর টিকা মার্কেটিং এর স্বার্থে কাজ করে। তারা প্রায়শই স্থানীয় টিকা উৎপাদন কার্যক্রমকে “মানদণ্ডের” দোহাই দিয়ে উৎপাদন বাধাগ্রস্থ করে এবং দরিদ্র দেশগুলোকে বহুজাতিক কর্পোরেশনগুলো থেকে চড়া দামে টিকা কিনতে কৌশলে বাধ্য করে। করোনা মহামারীর সময় বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠান “গ্লোব বায়োটেক” তাদের নিজস্ব উদ্ভাবিত “বঙ্গভ্যাক্স” টিকার ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের জন্য আবেদন করে, কিন্তু বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বেঁধে দেয়া আন্তর্জাতিক স্ট্যান্ডার্ড এবং প্রটোকলের দোহাই দিয়ে তাদের টিকার অনুমোদন দেয়া হয়নি, যা বিদেশি টিকার ক্ষেত্রে শিথিল ছিল। (দ্য ডেইলি স্টার, ১৬ জুন, ২০২১)। এটি প্রমাণ করে যে, পুঁজিবাদী ব্যবস্থা মালিকানার স্বাধীনতার নামে ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানিগুলোকে মুনাফা অর্জনের একচেটিয়া লাইসেন্স প্রদান করে। পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় সরকারগুলো জনগণের সেবক হওয়ার পরিবর্তে পুঁজিবাদী অভিজাত শ্রেণির স্বার্থ রক্ষায় নিয়োজিত। এখানে স্বাস্থ্যসেবাকে মৌলিক অধিকারের পরিবর্তে একটি পণ্য হিসেবে দেখা হয়। এই স্রষ্টাবিবর্জিত সেক্যুলার পুঁজিবাদী ব্যবস্থা মূলত বস্তুবাদী লাভকে মানুষের জীবনের ঊর্ধ্বে স্থান দেয়। যার ফলে রাষ্ট্র তার দায়িত্ব থেকে সরে এসে স্বাস্থ্যসেবাকে ব্যক্তিমালিকানাধীন ক্লিনিক ও ফার্মাসিউটিক্যালসের হাতে তুলে দেয়।
এই ভয়াবহ সংকটের বিপরীতে ইসলাম একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ও কার্যকর সমাধান প্রদান করে। ইসলাম রাষ্ট্রপ্রধান বা খলিফাকে জনগণের অভিভাবক হিসেবে দায়িত্ব দেয়। রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) বলেছেন, “তোমাদের প্রত্যেকেই একেকজন রাখাল বা দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেকেই তার অধীনস্তদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে” (সহিহ বুখারী)। ইসলামী শাসন খিলাফত ব্যবস্থায় জনস্বাস্থ্য রক্ষা করা রাষ্ট্রের ওপর বাধ্যতামূলক দায়িত্ব, কোনো করুণা নয়। খিলাফত রাষ্ট্র তার প্রতিটি নাগরিকের জন্য ঔষধ, হাসপাতাল এবং যাবতীয় চিকিৎসাসেবা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে প্রদান করে। এখানে মানুষের জীবনকে মুনাফার হাতিয়ার বানানোর কোনো স্থান নেই, বরং মানুষের জীবন রক্ষা করাই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। ইতিহাসের পাতায় তাকালে এর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত দেখা যায়। “১৭৯৮ সালে নেপোলিয়নের উসমানীয় খিলাফতের প্রদেশ মিশর অভিযানের সময় ফরাসি পণ্ডিত গোমার সেখানকার ৬০০ বছরের পুরনো স্বাস্থ্য ব্যবস্থা দেখে অভিভূত হয়েছিলেন। তিনি বর্ণনা করেছেন যে, বিমারিস্তানগুলোতে (হাসপাতাল) ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সকলে সমান চিকিৎসা পেত। চিকিৎসকদের উচ্চ বেতন দেওয়া হতো, সেখানে সমৃদ্ধ ফার্মেসি ছিল এবং সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরার সময় রোগীদের স্বর্ণমুদ্রা প্রদান করা হতো যাতে তাদের সাথে সাথেই কাজে নামতে না হয়।”
- মোঃ জাফর আহমেদ
