“টাকা ছাপাতে থাকলে মানুষের কষ্ট আরও বাড়বে”



খবর:

বাংলাদেশের মতো ঘাটতি বাজেটের দেশে সরকারকে টাকা ধার করে চলতে হয়। আর সেই ধার দেশি–বিদেশি যেকোনো উৎস থেকেই হতে পারে। সরকার আগে খরচ করে, এরপর টাকার সংস্থান করে। বাংলাদেশ সরকারের আয়ের একমাত্র উৎস রাজস্ব খাত, কিন্তু রাজস্ব আয়ের পরিস্থিতি খুবই খারাপ। চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে শুল্ক-কর আদায়ে ঘাটতি হয়েছে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা, যা এযাবৎকালের সর্বোচ্চ। দেশের ব্যবসা–বাণিজ্যের পরিস্থিতিও খুব ভালো নয়। তাই রাজস্ব আয় বাড়বে, সে আশা করা কঠিন। তেল ও গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির কারণে চাপে আছে মানুষ। এখন আবার নতুন চাপ যোগ হচ্ছে টাকা ছাপানোর মাধ্যমে। (https://www.prothomalo.com/business/analysis/8ilgvsopbd)

মন্তব্য:

রাষ্ট্র পরিচালনায় কখনো কখনো বিশেষ প্রয়োজনে ঘাটতি বাজেটের প্রয়োজন হতে পারে। যেমন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যুদ্ধাবস্থা ও সামরিক বাহিনীর কৌশলগত সক্ষমতা অর্জনে। কিন্তু, তাই বলে ৫০ বছরের অধিক সময় ধরে প্রতিবছর ঘাটতি বাজেট!? কোন অর্থনৈতিক যুক্তিতে এটা গ্রহনযোগ্য হতে পারে না। এই চিরস্থায়ী ঘাটতি বাজেট হল পশ্চিমাদের প্রেসক্রিপশন যেন তারা আমাদের অর্থনীতিকে চিরস্থায়ীভাবে নিয়ন্ত্রন করতে পারে। এর পাশাপাশি যুক্ত হয়েছে দেশের সেকুলার রাজনৈতিক গোষ্ঠীর নেতাকর্মীদের দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতা। যার কারণে অর্তনৈতিকভাবে শক্তিশালী বিশ্বের প্রথম ৫-৬ টি দেশের মধ্যে একটি হওয়ার সকল সম্ভাবনা থাকা সত্বেও বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যমত দারিদ্রপীড়িত একটি দেশ হয়ে আছে। সরকারের হাতে এখন কর্মকর্তা কর্মচারীদের নিয়মিত বেতন-ভাতা দেওয়ার পর্যাপ্ত অর্থও নেই।

এই অবস্থায় অর্থনীতিতে গতি ফেরানোর কথা বলে অর্থমন্ত্রী বড় বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তার যুক্তি দিয়ে আরো বিদেশী ঋণ ও বিদেশী বিনিয়োগের দিকে ইঙ্গিত করছে। (তলানিতে থাকা অর্থনীতিকে তুলে ধরতে বড় বিনিয়োগ জরুরি : অর্থমন্ত্রী)। বস্তুত, দেশি হোক কিংবা বিদেশি, বড় বিনিয়োগ দিয়ে অর্থনীতিতে গতিশীলতা আসে না। বড় বিনিয়োগের cost of capital-ও অনেক বড় হয় এবং বিনিয়োগকারীদের expected return-ও অস্বাভাবিক রকম বড় হয়। কিন্তু সেই অনুপাতে বড় বিনিয়োগে বড় আকারের কর্মসংস্থান তৈরী হয় না, অধিকাংশ বিদেশি বিনিয়োগের প্রকল্পে বিদেশি কর্মী নিয়োগের বাধ্যবাধকতা থাকে। বড় বিনিয়োগের সুবিধাভোগী হল গুটিকয়েক ক্ষমতাবান ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান, কিন্তু এর আর্থিক দায়ভার (cost of capital and debt) পুরোটাই বহন করে সাধারণ জনগণ। সুতরাং, বড় বিনিয়োগের গল্প দিয়ে সাধারণ মানুষের কষ্ট কমবে না, বরং এর দ্বারা মানুষের কষ্টের সাথে উপহাস করা হচ্ছে।

সাধারণ মানুষের কষ্ট লাঘব করার জন্য বড় ও বিদেশি বিনিয়োগ নয় বরং সরকারের আর্থনৈতিক নীতিতে পরিবর্তন আনতে হবে। পুঁজিবাদের সঞ্চয় ও সুদকেন্দ্রীক ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে সকল মূলধন পুঁজিপতি গোষ্ঠীর হাতে পুঞ্জিভূত হয়, যার মাধ্যমে দেশের সিংহভাগ মানুষের অর্থনৈতিক কর্মকান্ড সংকুচিত হয়। ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা ও সুদের আশায় মানুষ খরচের পরিবর্তে সঞ্চয়ে উদ্ভুদ্ধ হয়। কিন্তু বাস্তব অর্থনীতি গতিশীল হয় দেশের অধিকাংশ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি ও মানুষকে খরচে উদ্ভুদ্ধ করার মাধ্যমে। কারণ, একজনের ব্যয় হল আরেকজনের আয়; এটাই অর্থনীতির সার্বজনীন সূত্র। দেশের অধিকাংশ জনগোষ্ঠী তখনই ব্যয়ে উদ্ভুদ্ধ হবে যখন ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে তাদের হাতে পর্যাপ্ত অর্থ থাকবে, আয়ের নিয়মিত প্রবাহ থাকবে এবং দেশের সামগ্রীক অর্থনীতি ও ভবিষ্যতের ব্যাপারে জনগণের মধ্যে আস্থা তৈরী হবে। 

জনগণের হাতে পর্যাপ্ত অর্থ ও নিয়মিত অর্থের প্রবাহ নিশ্চিত করার জন্য কৃষিকে (ফসল, মৎস, গবাদিপশু) সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। কারণ এটা হল সবচেয়ে বড় খাত যেখানে বাস্তব সম্পদ তৈরী হয় ও জনগণের দৈনন্দিন চাহিদাগুলো পূরণ হয়। বর্তমানে দেশে প্রায় ৪.৫৫ লাখ হেক্টর জমি অনাবাদি পরে আছে (যার মধ্যে হাওর ও পাহাড়ি অঞ্চল অন্তর্ভুক্ত নয়)। হাওর ব্যবস্থাপনা ও পাহাড়সহ এই অনাবদি জমি চাষের আওতায় নিয়ে আসার অর্থনৈতিক নীতি গ্রহণ করে দেশে এক কৃষি বিপ্লবের সূচনা  হবে। কৃষিতে ব্যাপক উদ্বৃত্ত উৎপাদন করলে এই উদ্বৃত্ত খাদ্য দিয়ে মৎস ও গবাদিপশু পালনের ব্যয় অন্তত এক-তৃতীয়াংশে বা আরো নিচে নামিয়ে আনা সম্ভব যার মাধ্যমে দেশে মৎস ও গবাদিপশু বিপ্লব ঘটানো সম্ভব। এর মাধ্যমে জনগণের খাদ্য নিরাপত্তা অর্জিত হবে এবং জনগণের জীবনযাত্রার ব্যয়ের সবচেয়ে পীড়াদায়ক বিষয়টি নিয়ন্ত্রনে আসবে।

এরপর সবচেয়ে গুরুত্ব দিতে হবে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় ভারী শিল্প স্থাপনে, যেখানে মাঝারি ও হালাকা শিল্পের সকল যন্ত্রপাতি ও খুচরা যন্ত্রাংশ তৈরী হবে। এর জন্য যে বড় তহবিল প্রয়োজন হবে তা গণমালিকানাধীন প্রাকৃতিক সম্পদের আয় থেকে কিংবা যাকাতলব্ধ অর্থ থেকে ঋন গ্রহনের মাধ্যমে সরবরাহ করা যাবে। এই ভারী শিল্প স্থাপনের মাধ্যমে সকল আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তি সরবরাহের মাধ্যমে ব্যাপক কৃষি উৎপাদনের নিশ্চয়তা তৈরী হবে। এর পাশাপাশি ভারী শিল্পের সহায়তায় মাঝারি ও হালকা শিল্পের বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা দূর করার জন্য নানান উদ্ভাবনী চিন্তা ও অসংখ্য সম্ভাবনার দরজা উন্মোচিত হবে; যার মাধ্যমে দেশে ব্যাপক শিল্পায়ণ হবে। কারণ, মাঝারি ও হালকা শিল্প হল শহরকেন্দ্রীক অর্থনীতির প্রাণ এবং এই খাতে ব্যাপক কর্মসংস্থান তৈরী হবে ও জনগণের হাতে ব্যয় করার মত পর্যাপ্ত অর্থ নিশ্চিত করবে। মানুষকে সম্পদশালী করা ও তাদেরকে ব্যয়ে উদ্ভূদ্ধ করার মাধ্যমে ব্যাপক অর্থনৈতিক কর্মকান্ড সৃষ্টি করার এই নীতি হল একটি ইসলামী নীতি। এই নীতি বাস্তবায়ন করার জন্য বাংলাদেশের জনগণের এখন একটি খিলাফত রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রয়োজন। কারণ, খিলাফত রাষ্ট্র ছাড়া কোন সেকুলার-পুঁজিবাদী রাষ্ট্র এই নীতি বাস্তবায়ণ করবে না।

    -    রিসাত আহমেদ

Previous Post Next Post