“চূড়ান্ত অনুমোদন পেলো পদ্মা ব্যারাজ - ব্যয় ৩৩,৪৭৪ কোটি টাকা”



খবর: 

কয়েক দফা পেছানোর পর অবশেষে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় চূড়ান্ত অনুমোদন পেলো পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প। প্রকল্পের মোট প্রস্তাবিত ব্যয় ৩৩ হাজার ৪৭৪ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদী, কৃষি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় দীর্ঘদিনের সংকট নিরসনে বড় উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে সরকার। এ প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে শুষ্ক মৌসুমে পদ্মা নদীর পানি সংরক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ করে স্বাদু পানির প্রবাহ ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। জুলাই ২০২৬ থেকে জুন ২০৩৩ মেয়াদে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে.. (https://www.jagonews24.com/economy/news/1118799

মন্তব্য:

সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি শুধু অবকাঠামো প্রকল্প নয়, বরং খাদ্য নিরাপত্তা, কৃষি ও পরিবেশ পুনরুদ্ধারের কৌশলগত উদ্যোগ। তবে যে নদীর পানিপ্রবাহই অনিশ্চিত, সেখানে এত ব্যয়বহুল ব্যারেজ কতটা কার্যকর হবে? কারণ বাঁধ পানি তৈরি করতে পারে না, কেবল বিদ্যমান পানি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। পুরো প্রকল্পই নির্ভর করছে উজান থেকে আসা পানির ওপর, অথচ গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে ২০২৬ সালে। অর্থাৎ বাংলাদেশ নিজস্ব অর্থায়নে এমন এক প্রকল্পে বিনিয়োগ করছে, যার মূল উপাদান — পানিপ্রবাহ, নিয়ন্ত্রণ করে অন্য দেশ।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) এর মতে, পর্যাপ্ত ফিজিবিলিটি স্টাডি ও স্টেকহোল্ডার পরামর্শ ছাড়াই প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। তাদের আশঙ্কা, পাংশা থেকে রাজশাহী পর্যন্ত নদীতে পলি জমা বাড়তে পারে, আবার দক্ষিণ-পশ্চিমে বেশি পানি সরিয়ে দিলে মধ্যাঞ্চল ও মেঘনা মোহনায় প্রবাহ কমে গিয়ে আড়িয়াল খাঁসহ বিভিন্ন নদীতে লবণাক্ততা আরও বিস্তৃত হতে পারে। ফলে প্রশ্ন উঠছে পদ্মা ব্যারেজ কি সত্যিই দীর্ঘমেয়াদে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সংকট কমাবে, নাকি উজানের সহযোগিতা ছাড়া এটি পরিণত হবে আরেকটি ব্যয়বহুল অনিশ্চিত পরীক্ষায়। 

এছাড়া, এই উদ্যোগ ভারতের সাথে করা গঙ্গা পানি বন্টন চুক্তিতে — বাংলাদেশের দেন দরবার করবার ভিত্তিও দুর্বল করে দেয়। কারণ, এর মাধ্যমে মূলত ভারতের বাংলাদেশের উপর করা যাবতীয় জুলুম-নদী সন্ত্রাস হালকা (লঘুকরণ) হয়ে যায় । এর মাধ্যমে যদি দেশের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলে পানির সমস্যার সমাধান হয়েই যায় — তাহলে ভারত কেন তার নদী সন্ত্রাস বন্ধ করবে? আর বাংলাদেশই বা কোন সমস্যার কথা বলে ভারতকে অভিযুক্ত করবে?

দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পানি সংকট, সেচ, নৌপথ, মৎস্যসম্পদ, বনাঞ্চল — সব ক্ষেত্রে সৃষ্ট ভয়াবহ বিপর্যয়ের প্রকৃত উৎসমুখ ভারতের পানি বা নদী সন্ত্রাস — অর্থাৎ একটা রাজনৈতিক অপরাধ। কোনো টেকনিক্যাল ইস্যু না। ভারতের নদীসন্ত্রাস — বাংলাদেশের উপর তার চলমান জুলুমেরই এক্সটেনশন। নিছক কিছু টেকনিক্যাল উপায় দিয়ে রাজনৈতিক অপরাধের সমাধান হয় না, না হয় সেই অপরাধ দ্বারা সৃষ্ট বিপর্যয় আর ভোগান্তির অবসান।

অনেক সময় বলতে শোনা যায় যে, আমাদের দেশের অবস্থান ভাটি অঞ্চলে (ডাউনস্ট্রিম), আর ভারতের উজানে (আপস্ট্রিম)। ভারতের নদী সন্ত্রাসের শিকার হওয়া আমাদের চিরকালীন ভাগ্য, এটা থেকে বের হওয়ার কোন উপায় নেই। অথচ, আফ্রিকাতে ডাউনস্ট্রিম দেশ হওয়ার পরেও — নীলনদ নিয়ে মিশরের স্বেচ্ছাচারী রেজিমের প্রতিনিয়ত আধিপত্যমূলক আচরণের স্বীকার হয় সুদান, ইথিওপিয়া।

অর্থাৎ, ভৌগলিক অবস্থান, কিংবা টপোগ্রাফিক (ভূপ্রাকৃতিক) বাস্তবতা এখানে নির্ণায়ক নয়—কোন দেশ কোন দেশের উপর নদী নিয়ে আধিপত্য বিস্তার করবে। বরং, পলিটিক্যাল পাওয়ার ডাইনামিকস-ই এক্ষেত্রে প্রধান নির্ণায়ক। রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী দেশ ডাউনস্ট্রিম থাকলেও—তার অনুমতি ব্যতীত আপস্ট্রিমের দুর্বল দেশ কোনো রকমের নদী শাসন/পানি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। আর এই রাজনৈতিক ক্ষমতা ও প্রভাব আসে রাষ্ট্রটি কত পোক্তভাবে তার যাবতীয় স্টেট অ্যাপারেটাস (অর্থনৈতিকখাত থেকে শুরু করে শিক্ষাখাত, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি খাত, প্রতিরক্ষা খাত, শিল্প খাত) গড়ে তুলেছে।

প্রশ্ন হলো, এই উপনিবেশবাদী ধর্মনিরপেক্ষ-পুঁজিবাদী ব্যবস্থা আমাদেরকে গত ১০০ বছরে — পরনির্ভর ফোকলা অর্থনীতি, প্রজ্ঞা ও বাস্তবতা বিবর্জিত-প্রয়োগহীন শিক্ষা ব্যবস্থা, আর অনুন্নত সামরিক ও শিল্প খাত ছাড়া কি দিয়েছে? 

একমাত্র ইসলাম একটি রাষ্ট্রকে প্রয়োজনীয় পলিটিক্যাল ইমিউনিটি দিতে পারে — যা দ্বারা রাষ্ট্রটি স্বনির্ভর অর্থনীতি, বিশ্বমানের প্রায়োগিক শিক্ষা ব্যবস্থা, আর নেতৃত্বশীল সামরিক ও শিল্প খাত দ্বারা অভ্যন্তরীণভাবে শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে। 

রোমান করদ রাজ্য থাকা অবস্থায়, মিসরের নীলনদ আর নীলনদ ভিত্তিক কৃষি ও শস্য উৎপাদন কনস্টান্টিনোপলের স্বার্থে নিয়ন্ত্রিত হতো, আর মিসরীয়রা ছিল উচ্চ করের বোঝায় পিষ্ট জনগোষ্ঠী। পরবর্তীতে খিলাফতে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর মিসরকে শোষিত শস্যভাণ্ডার নয়, বরং ইসলামী রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় অর্থনৈতিক অঞ্চলে রূপান্তর করা হয়। ফুস্তাতকেন্দ্রিক প্রশাসনিক ও সেচ সংস্কারের মাধ্যমে নীলনদের উৎপাদনের ওপর রোমান নিয়ন্ত্রণ স্থায়ীভাবে নির্মূল করা হয়। 

পশ্চিমা ব্যবস্থা বাদ দিয়ে বাংলাদেশ যদি ইসলামের ইমিউনিটি দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে আন্তঃনদী সংক্রান্ত ইসলামী নীতি বাস্তবায়নের মাধ্যমে স্পর্শকাতর “পানি এবং নদী খাতকে” সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে পার্শ্ববর্তী শত্রুরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ থেকে চিরতরে নির্মূল করবে, অগণিত ক্যানাল-ইরিগেশন-ব্যারাজ প্রকল্প বাস্তবায়িত করে দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলসহ সমগ্র দেশের ক্রিটিক্যাল “ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট” সংক্রান্ত সমস্যার সমাধান করবে।

    -    জুলফি আবেদ

Previous Post Next Post