খবর:
রাজধানীর পল্লবীতে শিশু রামিসা আক্তার ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ফুঁসে উঠেছে এলাকাবাসী। হত্যাকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তি ও দ্রুত বিচারের দাবীতে বৃহস্পতিবার (২১ মে) সন্ধ্যায় মিরপুর-১০ থেকে ১২ নম্বর সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন স্থানীয়রা। গত মঙ্গলবার (১৯ মে) সকালে মিরপুর–১১ নম্বরের বি ব্লকের একটি ভবনের তৃতীয় তলার ফ্ল্যাট থেকে শিশু রামিসা আক্তারের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। প্রাথমিকভাবে জানা যায়, শিশুটিকে ধর্ষণ শেষে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে এবং হত্যার পর মরদেহ গুম করার চেষ্টা চালানো হয়েছিল। যদিও শেষ পর্যন্ত ফ্ল্যাটের ভেতর থেকেই দেহের অংশ উদ্ধার করে পুলিশ (https://www.ittefaq.com.bd/790086)
মন্তব্য:
সাত বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণ ও নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনাটি কোনো একক বা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় বরং এটি ধর্মনিরপেক্ষ উদারবাদী ব্যবস্থার এক অনিবার্য বাস্তবতা। রামিসার এই নির্মম পরিণতি এই প্রথম কোনো ঘটনা নয়, এবং বিদ্যমান কাঠামো অপরিবর্তিত থাকলে এটিই শেষ ঘটনা ভাবার কোন সুযোগ নেই। যখন একটি সমাজব্যবস্থা তার সামগ্রিক চালিকাশক্তি থেকে ঐশ্বরিক ধারণা ও বিধিবিধানকে বাদ দিয়ে কেবল মানুষকে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ ও লাগামহীন স্বাধীনতার নামে তার প্রবৃত্তি পূরণে স্বাধীনভাবে ছেড়ে দেয় তখন বলী হতে হয় রামিসার মত নিষ্পাপ শিশুদের। ধর্মনিরপেক্ষ উদারবাদী ব্যবস্থা ব্যক্তি স্বাধীনতার যে ধারণাটি প্রচার করে, তার অন্যতম প্রধান ও মারাত্মক কুফল হলো সমাজে শিশুদের “অতি-যৌনতাকরণ” (Hyper-sexualization)। সেক্যুলার ব্যবস্থা ব্যক্তি স্বাধীনতার নামে বিনোদন মাধ্যম, বিজ্ঞাপন, প্রযুক্তি এবং ইন্টারনেটের মাধ্যমে সমাজের প্রতিটি স্তরে যৌন উদ্দীপক উপাদানগুলোকে ছড়িয়ে দিচ্ছে । শিশুদের পোশাক থেকে শুরু করে কার্টুন, মিউজিক ভিডিও, সিনেমা, কিশোর ড্রামা, গেমিং ইন্ডাস্ট্রি, সবকিছুতে শিশু এবং কিশোরীদের করা হচ্ছে পণ্যায়ন যা সমাজে পেডফিলিয়ার মত যৌণ অপরাধের প্রতি সংবেদনহীন (Desensitisation) মনোভাব তৈরি করছে। এই সংবেদনহীনতার কারণে অপরাধীদের কাছে একটি শিশুর পবিত্রতা (Innocence) কিংবা একজন শতবর্ষী নারীর সম্মান কোনো গুরুত্ব পায় না, বরং তাদের কেবলই বিকৃত লালসা পূরণের সস্তা মাধ্যম হিসেবে দেখা হয়। পেডফিলিয়া বা শিশুদের প্রতি এই বিকৃত যৌন আচরণের বৈশ্বিক চিত্রটি আরও ভয়ঙ্কর ও বিপর্যয়কর। সম্প্রতি ফাঁস হওয়া বিশ্বব্যাপী সাড়া জাগানো এপস্টিন নথিতে উঠে আসছে ধর্মনিরপেক্ষ উদারবাদী ব্যবস্থার সর্বোচ্চ চূড়ায় বসে থাকা এলিট শ্রেণীর চারিত্রিক কুকর্মের পাহাড়সম রেকর্ড — যারা নিজেদেরকে সভ্যতার ধারক-বাহক বলে দাবী করে। এপস্টাইন কেইস থেকে বের হয়ে এসেছে শীর্ষস্থানীয় ও ক্ষমতাধর রাজনীতিবিদ, রাষ্ট্রপ্রধান, রাজপরিবারের সদস্য, প্রযুক্তি ও ব্যবসা জগতের শীর্ষ ধনকুবের এবং হলিউডের তারকারা কিভাবে কোমলমতি শিশুদের আপহরণ এবং তাদের নিজেদের বিকৃত যৌন লালসা পূরণে ব্যবহার করে। এপস্টাইন কেস ছাড়াও পশ্চিমা দেশগুলোতে শিশু ধর্ষণের এবং যৌন নির্যাতনের বাস্তব পরিসংখ্যান রীতিমতো শিউরে ওঠার মতো। ইউনিসেফ, ডব্লিউএইচও (WHO) এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার সাম্প্রতিক ডেটা অনুযায়ী, পশ্চিমা সেক্যুলার দেশগুলোতে শিশু যৌন নিপীড়ন এক সামাজিক সংকটে রূপ নিয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বৈশ্বিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, পৃথিবীর প্রতি ৫ জন নারীর মধ্যে ১ জন এবং প্রতি ১৩ জন পুরুষের মধ্যে ১ জন ১৮ বছর বয়সের আগেই শৈশবে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের “রেইন” (RAINN) সংস্থার তথ্যানুযায়ী, আমেরিকায় প্রতি ৬৮ সেকেন্ডে একজন মানুষ যৌন নিপীড়নের শিকার হন এবং এই ভুক্তভোগীদের একটি বিশাল অংশই শিশু ও কিশোর-কিশোরী। যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সির (NCA) এক চাঞ্চল্যকর তথ্যে দেখা গেছে, সে দেশে কেবল ইন্টারনেট থেকে শিশুদের বিকৃত ছবি ডাউনলোড করা পেডফাইল বা বিকৃতকামীদের সংখ্যা প্রায় ৫০ হাজার থেকে ৮০ হাজারে পৌঁছেছে, যাদের সবাইকে একসাথে বিচারের আওতায় আনার সক্ষমতা পুলিশের নেই। এই বিপজ্জনক বাস্তবতা আমাদের দেখিয়ে দেয় স্রষ্টাবিহীন সেক্যুলার লিবারেল সিস্টেম ব্যক্তি স্বাধীনতার নামে মানুষকে লাগামহীন প্রবৃত্তি পূরণে বিকৃতির কোন লেভেলে নামিয়ে দিতে পারে।
অথচ, কিছু সেক্যুলার মিডিয়া বক্তিত্ব ও তথাকথিত নারী অধিকার কর্মী এই ব্যবস্থার কুৎসিত চেহারা ঢাকতে ইসলামী শারী’আহ্ নিয়ে বিতর্কে লিপ্ত হয়েছে। তারা বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে এতটাই অসাড় যে দূষিত সেক্যুলার ব্যবস্থায় ইসলামী শারী’আহ্’র কার্যকারিতা নিয়ে বিতর্ক করছে, অথচ তারা এটা বুঝতে অক্ষম যে ইসলামী শারী’আহ্ কেবলমাত্র ইসলামী জীবনব্যস্থা খিলাফাহর অধিনেই কার্যকর। ইসলাম মানুষের সমস্যাগুলোকে একটি সুনির্দিষ্ট দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করে এবং তা সমাধানে একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামো দেয়। তারা এটাও বুঝতে অক্ষম যে ইসলামই কেবলমাত্র তৎকালীন আরব সমাজে কন্যা শিশুদের বেঁচে থাকার অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছে এবং ইসলামী খিলাফত রাষ্ট্রই নারীর সম্মান রক্ষার্থে রাষ্ট্রীয় সামরিক বাহিনীকে অভিযানে প্রেরণের মত দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। আবার, অনেক রাজনীতিবিদ মূল সমস্যা অর্থাৎ এই সেক্যুলার লিবারেল পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে আড়াল করে রামিসার পরিবারকে সাহায্য করা বা বিচারের আশ্বাস দেওয়ার ভণ্ডামি করছেন কেননা তারাই আবার ব্যক্তি স্বাধীনতার নামে আঠারো বছরের ঊর্ধ্বে যেকোনো অবাধ ও বিকৃত যৌনাচারকে আইনি বৈধতা দেওয়ার পক্ষে ওকালতি করেন। প্রশ্ন হচ্ছে, এই ভন্ডামী আর কত দিন?
- মোঃ জাফর আহমেদ
