১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি, ১ কোটি কর্মসংস্থান: প্রবৃদ্ধির নতুন পথে সরকার



খবর:

দেশের অর্থনীতিকে ভঙ্গুর দশা থেকে সমৃদ্ধির দিকে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে প্রচলিত পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা মডেল থেকে বেরিয়ে এসে বিএনপি সরকার একটি পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত কাঠামো তৈরি করেছে। এই উন্নয়ন রূপরেখায় দ্বিমুখী লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে — ২০৩০ সালের মধ্যে ১ কোটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ২০৩৪ সালের মধ্যে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ে তোলা, যা বর্তমান অর্থনীতির আকারের প্রায় দ্বিগুণ। (https://www.tbsnews.net/bangla/Economy/news-details-491901)

মন্তব্য:

‘পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা’ এর বদলে ‘কৌশলগত কাঠামো’ বলা হলেও এখানে অর্থনৈতিক দর্শনে মৌলিক কোনো পরিবর্তন নেই। আগে যেমন পরিকল্পনা জিডিপি প্রবৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হতো, এখনও একইভাবে প্রবৃদ্ধিকেই মূল লক্ষ্য ধরা হয়েছে। অথচ অর্থনীতির প্রকৃত উদ্দেশ্য মানুষের মৌলিক চাহিদা — খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা ও শিক্ষা ইত্যাদি নিশ্চিত করা এবং মানুষের সামর্থ্য অনুযায়ী উন্নত জীবনযাপনের সুযোগ সৃষ্টি করা। কিন্তু জিডিপি-কেন্দ্রিক পুঁজিবাদী কাঠামো মূলত “কত উৎপাদন বাড়লো” সেটিকে গুরুত্ব দেয়, “কারা সেই সম্পদের মালিক হলো” বা “সাধারণ মানুষের জীবনে কতটা নিরাপত্তা এলো” — তা নয়। বিশ্বব্যাপী পুঁজিবাদী ব্যবস্থার অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়লেও বৈষম্য কমেনি; বরং বেড়েছে। এই ব্যবস্থায় বাংলাদেশের জিডিপি ১ ট্রিলিয়ন ডলার হওয়ার আগেই এলন মাস্কের সম্পদ ১ ট্রিলিয়ন ডলার হয়ে যাবে। স্পষ্টতই এই ব্যবস্থার উচ্চ প্রবৃদ্ধির গল্পের নিচে মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব, চিকিৎসা ও শিক্ষার ব্যয় বৃদ্ধি ইত্যাদির চাপে বৃহৎ জনগোষ্ঠী পিষ্ট হয়। তাই পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মধ্যে শুধু ‘পরিকল্পনা’র স্থলে ‘কৌশলগত কাঠামো’ নামকরণ করে ভিন্ন ফল আশা করা যুক্তিযুক্ত নয়। কারণ কাঠামোগত দর্শন একই থাকলে ফলও মূলত একই থাকবে।

সরকারের পরিকল্পনায় “রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বাধীন উপর-থেকে-নিচ প্রবৃদ্ধি” থেকে সরে এসে বেসরকারি খাতভিত্তিক উন্নয়নের কথা বলা হলেও এখানেও প্রচলিত পুঁজিবাদী “ট্রিকল ডাউন ইকোনমিকস”-এর বাইরে কোনো বাস্তব বিকল্প দেখানো হয় নি। এটি পুঁজিবাদী ব্যবস্থার কাঠামো যাতে ধনী ও বড় বিনিয়োগকারীদের হাতে মূলধন কেন্দ্রীভূত করা হয়, এই আশায় যে তার সুফল পরে নিচের স্তরে পৌঁছাবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, সুদভিত্তিক অর্থনীতি এবং কৃত্রিম মুদ্রা সম্প্রসারণের মাধ্যমে যে সম্পদ সৃষ্টি হয়, তা শেষ পর্যন্ত সীমিত গোষ্ঠীর হাতেই কেন্দ্রীভূত থাকে। ফলে যে প্রবৃদ্ধি হয় তা বাস্তব উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি নয় বরং একটি বুদবুদ অর্থনীতি হয়। এতে ব্যক্তি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এমনকি রাষ্ট্রও ঋণের ফাঁদে পড়ে যায় এমনকি দেউলিয়া হয়ে যায়। আজ যদি ডলারের হেজিমনি লোপ পায় তবে যুক্তরাষ্ট্রও দেউলিয়া হয়ে যাবে এবং ডালারের ঋণের উপরে টিকে থাকা অন্য অর্থনীতিগুলোও দেউলিয়া হওয়ার উপক্রম হবে। অর্থাৎ পুঁজিবাদী কাঠামোর প্রবৃদ্ধি আসলে ভেতরে ভেতরে একটি অর্থনৈতিক দেউলিয়াত্ব বহন করে, এধরনের প্রবৃদ্ধি আরও বাড়ানোর মানে হলো এই দেউলিয়াত্ব প্রবনতা আরও বাড়ানো। 

এর বিপরীতে প্রয়োজন বাস্তব সম্পদভিত্তিক অর্থনীতি — ইসলামী অর্থনৈতিক নীতিমালা সহজেই তা গঠন করে। ইসলামে সুদ নিষিদ্ধ এবং রাষ্ট্র ফিয়াট মুদ্রা তৈরি করে না; ফলে অর্থনীতি ঋণনির্ভর কৃত্রিম প্রবৃদ্ধির ফাঁদ থেকে মুক্তি পায়। ইসলামে কৃষি জমি অনাবাদি ফেলে রাখা যায় না (৩ মৌসুমের বেশী) এবং রাষ্ট্রের দায়িত্ব হিসেবে কৃষকের জন্য সেচ, বীজ, বাজার ও অবকাঠামো নিশ্চিত করা হয়। এর ফলে প্রকৃত সম্পদ বৃদ্ধি পায় এবং বিপুল জনগোষ্ঠী উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। ইসলাম যাকাত ও অন্যান্য সম্পদ করের মাধ্যমে সম্পদ জমা রাখা নিরুৎসাহিত করে ফলে অর্থ সমাজে চলমান থাকে এবং ক্ষুদ্র ব্যবসা ও উৎপাদনমুখী খাতে বিনিয়োগ বাড়ে। পাশাপাশি তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি ও খনিজ সম্পদের মতো মৌলিক খাতকে গণমালিকানাধীন সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করার ফলে এসব ব্যবসা উদ্যোগ স্বল্পমূল্যে এসব মৌলিক সম্পদের সুবিধা ভোগ করে, এতে এদের উৎপাদন সক্ষমতা ভালো থাকে। মনোপলি বা কৃত্রিম সংকট তৈরির সুযোগ না থাকায় সাধারণ মানুষের জন্য ব্যবসা ও উদ্যোগ গ্রহণ সহজ ও লাভজনক হয়। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হয় শিক্ষা, গবেষণা, সহজ-বিচার ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা — যাতে অর্থনীতি বাস্তব উৎপাদন ও ন্যায়সঙ্গত বণ্টনের ভিত্তিতে গড়ে ওঠে। এভাবে ঋণের ফাঁদের চক্রের বিপরীতে একটি উৎপাদনভিত্তিক প্রবৃদ্ধির চক্র তৈরি হয়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ্ (ﷻ) বলেন, “…যাতে ধন-সম্পদ তোমাদের মধ্যকার বিত্তশালীদের মাঝেই কেবল আবর্তিত না থাকে…” (সূরা হাশর : ৭)। তাই ইসলামী শাসনব্যবস্থায় অর্থনীতি মিথ্যা প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান নয়; বরং এটি একটি শারী’আহ্ ভিত্তিক দায়িত্ব, যেখানে রাষ্ট্রের লক্ষ্য হয় মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, ন্যায়সঙ্গত সম্পদ বণ্টন এবং শোষণমুক্ত বাস্তব অর্থনীতি প্রতিষ্ঠা।

    -    মোহাম্মদ তালহা হোসেন 

Previous Post Next Post