খবর:
যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় দুই বাংলাদেশি শিক্ষার্থী জাহিদ লিমন এবং নাহিদা বৃষ্টির হত্যার ঘটনায় কমিউনিটি এবং আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের মধ্যে শোক ও আতঙ্কের ছায়া নেমে এসেছে। এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের পর শিক্ষার্থীদের আবাসন ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন উঠেছে। শিক্ষার্থীরা বলছেন, অফ-ক্যাম্পাস বাসস্থানে নিরাপত্তা ব্যবস্থা দুর্বল। বিশেষ করে যারা রুমমেটের সঙ্গে বসবাস করেন, তাদের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। তবে আতংকিত না হয়ে সচেতন ও সতর্ক থেকে পরিস্থিতি মোকাবিলা করার আহবান ওয়াশিংটনস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের (https://ln.run/g0Z7_)।
মন্তব্য:
যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় দুই বাংলাদেশি শিক্ষার্থী জাহিদ লিমন এবং নাহিদা বৃষ্টির বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা বিদেশে উচ্চশিক্ষা, কাঙ্ক্ষিত চাকরি এবং নিরাপদ জীবনের স্বপ্নে বিভোর সমগ্র আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের মধ্যে নতুন করে গভীর আতঙ্ক ও উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। বহির্বিশ্বের অনেকর কাছেই যুক্তরাষ্ট্র একটি স্বপ্নের দেশ বা ‘ড্রিমল্যান্ড’ হিসেবে পরিচিত হলেও, এই মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডটি সেই ধারণাকে নাড়া দিয়েছে এবং শিক্ষার্থীদের আবাসন ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তার প্রশ্নটিকে সামনে নিয়ে এসেছে।
মূলত, যুক্তরাষ্ট্রে এমন ঘটনা বিচ্ছিন্ন কোনো বিষয় নয়, বরং দেশটিতে অস্ত্র সহিংসতা এবং প্রাণঘাতী অপরাধের হার অত্যন্ত বেশি। গান ভায়োলেন্স আর্কাইভ (Gun Violence Archive) এবং সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (CDC)-এর সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি বছর আগ্নেয়াস্ত্রজনিত কারণে ৪৪,০০০ থেকে ৪৫,০০০-এর বেশি মানুষের মৃত্যু ঘটে, যার মধ্যে ২০,০০০-এর বেশি মানুষ প্রত্যক্ষ হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়। এছাড়া, দেশটিতে প্রতি বছর ৬০০-এর বেশি ‘মাস শুটিং’ বা বড় ধরনের বন্দুক হামলার ঘটনা ঘটে থাকে। অন্যদিকে, বিভিন্ন মানবাধিকার ও সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি বছর পুলিশি সহিংসতায় ১,০০০-এর বেশি মানুষের প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। এর বাইরেও গুপ্তহত্যা ও বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের শিকার হয়ে বহু বিদেশি শিক্ষার্থী ও অভিবাসী নিরাপত্তাহীনতার মুখে পড়ছেন। এসব পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে, আমেরিকায় সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের নিরাপত্তা কতটা ভঙ্গুর। কেবল নিরাপত্তা সংকটই নয়, যুক্তরাষ্ট্রের মতো সমাজে বিদেশি শিক্ষার্থীরা বর্ণবৈষম্যের শিকার হন এবং তাদের তৃতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসেবে দেখার প্রবণতাও রয়েছে। ন্যাশনাল সেন্টার ফর এডুকেশন স্ট্যাটিস্টিকস (NCES)-এর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোতে প্রতিনিয়ত বিদ্বেষমূলক অপরাধ বা হেট ক্রাইম সংঘটিত হয়, যা আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করে। এই বাস্তবতা প্রমাণ করে, আমেরিকার মত দেশের পারিবারিক ও সামাজিক নিরাপত্তা কতটা ভঙুর। এটি স্পষ্ট যে, আমাদের দেশ থেকে যারা উন্নত জীবনের আশায় আমেরিকায় পাড়ি জমান, তারা মূলত পশ্চিমা সেক্যুলার পুঁজিবাদী ব্যবস্থার ফাঁদেই পড়েন। পুঁজিবাদী ব্যবস্থার ধারক-বাহক আমেরিকায় সারাবিশ্ব থেকে লুণ্ঠিত সম্পদের কারণে ‘ট্রিকেল ডাউন’ নীতির আশির্বাদে কিছু মানুষের জন্য উন্নত শিক্ষা বা চাকরির সুযোগ তৈরি হলেও, এই ব্যবস্থা মানুষের পারিবারিক বন্ধন কিংবা সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেনি।
শুধু আমেরিকায় নয়, এই সেক্যুলার পুঁজিবাদী ব্যবস্থা পৃথিবীর কোথাও মানুষকে সার্বিক মুক্তি দিতে পারেনি। তাই পুঁজিবাদী ব্যবস্থার ‘ট্রিকেল ডাউন’ নীতির অন্ধ অনুসরণে উন্নত জীবনের স্বপ্নে বিভোর না হয়ে, আমাদের উচিত এই ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা, যা আমেরিকাকে আমাদের সম্পদ লুণ্ঠনের সুযোগ করে দিয়েছে এবং দেশে কর্মসংস্থান ও উন্নত শিক্ষার পথে সংক্টট তৈরি করেছে। আমাদেরকে এমন ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার দাবি তুলতে হবে যা আমাদের জীবন এবং সম্পদের নিরাপত্তা দিবে এবং কাঙ্খিত ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা দিবে। ইসলামের রাষ্ট্রব্যবস্থা তথা খিলাফত ব্যবস্থা ট্রিকেল ডাউন বা চুইয়ে পড়া অর্থনৈতিক নীতির ওপর নির্ভর করে না, বরং এটি অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিকভাবে প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব গ্রহণ করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “ইমাম বা খলিফা হলেন একজন অভিভাবক, তাই তিনি তাঁর জনগণের দেখাশোনা ব্যাপারে দায়িত্বশীল” (সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)। এই দায়িত্ববোধের কারণে খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিটি নাগরিকের জানমালের নিরাপত্তা ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করে, যার বাস্তব উদাহরণ হলো আব্বাসীয় খিলাফত আমলে বাগদাদ নগরী। বাগদাদ শুধুমাত্র খিলাফত রাষ্ট্রের রাজধানী এবং এর নাগরিকদের জন্যই একটি নিরাপদ ও উন্নত নগরী ছিল না, বরং এর উন্নত নিরাপত্তা, সামাজিক ন্যায়বিচার, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং বৈচিত্র্যময় সুযোগের কারণে এটি ইউরোপীয়সহ সারা বিশ্বের মানুষের জন্যও অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও নিরাপদ একটি নগরী হিসেবে বিবেচিত হতো।
- মোঃ জাফর আহমেদ
