খবর:
দেশের অন্যতম শস্যভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত যশোরে এবার লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। দেরিতে চাষাবাদ শুরু হলেও অনুকূল আবহাওয়া এবং উন্নতমানের বীজ, সার ও কীটনাশকের সরবরাহ ঠিক থাকায় ফলন অত্যন্ত ভালো হয়েছে। কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, জেলাজুড়ে এবার প্রায় আড়াই লাখ মেট্রিক টন চাল উদ্বৃত্ত থাকবে, যা জেলাবাসীর চাহিদার তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ (https://www.tbsnews.net/bangla/bangladesh/news-details-490761) ।
মন্তব্য:
দেশের অন্যতম শস্যভাণ্ডার যশোরে এবার লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি ধান উৎপাদন অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক হলেও বর্ধিত উৎপাদন কৃষকদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে পারছে না। এর মূল কারণ পুঁজিবাদী অর্থনীতির উৎপাদন ও সরবরাহ সংক্রান্ত ভ্রান্ত দর্শন। পুঁজিবাদী অর্থনীতির মূল ভিত্তি হলো উৎপাদনকে অর্থনীতির প্রধান সমস্যা হিসেবে গণ্য করা। পুঁজিবাদী অর্থনীতিবিদদের মতে, মানুষের অসীম অভাব মেটানোর জন্য কেবল উৎপাদন বাড়িয়ে সম্পদের স্বল্পতা দূর করাই হলো অর্থনীতির মূল কাজ। তারা মনে করে, বাজারে যদি পণ্যের প্রাচুর্য থাকে, তবে সরবরাহ ব্যবস্থা চাহিদা ও যোগানের ভিত্তিতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থায় পৌঁছে যাবে। কিন্তু এবারে যশোরসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় ধানের বাম্পার ফলনের বাস্তব চিত্র এই ধারণাকে মিথ্যা প্রমাণ করে। উৎপাদন চাহিদার চেয়ে দ্বিগুণ হওয়া সত্ত্বেও কৃষকরা প্রতি বিঘায় ৩ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত লোকসান গুনছেন। যেখানে এক বিঘা ধান চাষে শ্রমিক, বীজ, সার ও সেচ বাবদ খরচ হচ্ছে ২৩ থেকে ২৫ হাজার টাকা, সেখানে বাজারে ধান বিক্রি করে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ২০ হাজার টাকা।
পুঁজিবাদী অর্থনীতির এই উৎপাদনমুখী চিন্তা কেবল মোট জাতীয় উৎপাদন (GDP) বৃদ্ধির পরিসংখ্যানে সীমাবদ্ধ থাকে, কিন্তু উৎপাদনের সুফল প্রান্তিক কৃষকের ঘর পর্যন্ত পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়। কারণ, পুঁজিবাদী অর্থনীতি সরবরাহ বা বণ্টনকে কোনো স্বতন্ত্র সমস্যা মনে না করে, একে বাজারের “অদৃশ্য হাত” বা “Invisible Hand” এর উপর ছেড়ে দেয়। এর ফলে সরবরাহ ব্যবস্থায় মধ্যস্বত্বভোগী বাজার নিয়ন্ত্রণকারী গোষ্ঠীদের জন্ম হয়। পুঁজিবাদী অর্থনীতির “Theory of Marginal Utility” বা “প্রান্তিক উপযোগ তত্ত্ব” বলে যে, কোনো পণ্যের যোগান যখন বাড়তে থাকে, তখন তার প্রান্তিক উপযোগিতা বা প্রয়োজনীয়তা কমে যায় এবং এর ফলে বাজার মূল্যও হ্রাস পায়। এক্ষেত্রে, মধ্যস্বত্বভোগী ও আড়তদাররা ভাল করেই তারা জানে যে, পর্যাপ্ত উৎপাদনের সময় কৃষকদের ধান সংরক্ষণ করার মত সক্ষমতা নেই। যখন বাজারে ধানের যোগান তুঙ্গে থাকে, তখন তারা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কৃত্রিমভাবে দাম কমিয়ে দেয়। কৃষক তার দৈনন্দিন খরচ মেটাতে এবং পরবর্তী মৌসুমের প্রস্তুতির জন্য বাধ্য হয়ে কম দামে ধান বিক্রি করে দেয়। প্রান্তিক উপযোগ তত্ত্ব অনুযায়ী, স্থানীয়ভাবে চাহিদা পূরণ হয়ে যাওয়ার পর অতিরিক্ত ধান কৃষকের কাছে একপ্রকার বোঝা হয়ে দাঁড়ায়, আর এই সুযোগেই মধ্যস্বত্বভোগীরা বাজার নিয়ন্ত্রণ করে নামমাত্র মূল্যে ফসল হাতিয়ে নেয়। যার ফলে দেখা যায়, কৃষক পর্যায়ে এক মণ কাঁচা ধানের দাম ৮০০ টাকা হলে, সেই ধান হাত বদল হয়ে খুচরা বাজারে প্রায় ১,৮০০ থেকে ২,২০০ টাকা মণ (বা প্রায় ৪৫ থেকে ৫৫ টাকা কেজি) দরে বিক্রি হয়। এই অতিরিক্ত মুনাফা কৃষক পায় না, বরং পুঁজিবাদী ব্যবস্থার আশ্রয়ে থাকা গুটিকয়েক মধ্যস্বত্বভোগী এই মুনাফা লুটে নেয়।
পুঁজিবাদী ব্যবস্থা এই সমস্যা সমাধানে অনেক সময় “প্রাইস ম্যানিপুলেশন” বা জোরপূর্বক মূল্য নির্ধারণের চেষ্টা করে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। সরকার যখন বিক্রয়মূল্য নির্ধারণ করে দেয় তখন ভোক্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, আবার ক্রয়মূল্য নির্ধারণ করলে বিক্রেতা বা কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই এই অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রতিটি সমাধানই ত্রুটিপূর্ণ, কারণ এটি সমস্যার মূল “বণ্টন প্রক্রিয়াকে” গুরুত্ব দেয় না। যার কারণে অতিরিক্ত উৎপাদন হওয়া স্বত্ত্বেও এর থেকে অর্জিত মুনাফা মুষ্টিমেয় পুঁজিপতির হাতে পুঞ্জীভূত হয়, আর ক্ষতিগ্রস্থ হয় সাধারণ কৃষকরা।
এর বিপরীতে ইসলামী অর্থনীতি অত্যন্ত বাস্তবমুখী এবং সুশৃঙ্খল সমাধান দেয়। ইসলাম উৎপাদন এবং বণ্টনকে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করে। ইসলামে উৎপাদন হলো “Economic Science” বা “অর্থনৈতিক বিজ্ঞান” সংক্রান্ত একটি বিষয়, যা মানুষের সৃজনশীলতা ও গবেষণার উপর নির্ভরশীল। ইসলাম উৎপাদন বাড়াতে বাধা দেয় না, কিন্তু বণ্টন প্রক্রিয়াকে (Distribution) অর্থনীতির প্রধানতম সমস্যা হিসেবে দেখে এবং এর জন্য বিস্তারিত বিধিবিধান প্রদান করে। যেমন, ইসলামে মধ্যস্বত্বভোগীদের দ্বারা বাজার নিয়ন্ত্রণ বা “এহতিকার” (পণ্য মজুদকরণ) এবং “নজশ” (কৃত্রিমভাবে দাম কমানো বা বাড়ানো) কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি বাজারে পণ্যের সংকট তৈরি করে মজুদদারি করে, সে পাপিষ্ঠ” (সহিহ মুসলিম: ১৬০৫)। ইসলামের অর্থনীতি কোন রকম বাঁধা ব্যতিরেকে অবাদে বাজারে পন্য সরবরাহ নিশ্চিতের তাগিদ দেয়, এক্ষেত্রে রাষ্ট্র কর্তৃক পণ্যের দাম নির্ধারণের মত কর্মকাণ্ড সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তাছাড়া, ইসলামের অর্থনীতি মানুষের চাহিদাকে কেবল অঞ্চল ভিত্তিক বিবেচনা না করে সামষ্টিকভাবে বিবেচনা করে। তাই, ইসলামী খিলাফত রাষ্ট্র এক অঞ্চলের উদ্বৃত্ত পণ্য অন্য অঞ্চলে যেখানে অভাব আছে সেখানে দ্রুত স্থানান্তর নিশ্চিত করবে। এতে করে কোনো এক অঞ্চলে বাম্পার ফলনের কারণে প্রান্তিক উপযোগ কমে গিয়ে দাম একেবারে পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয় না, বরং সামষ্টিক চাহিদার সাথে তা ভারসাম্যপূর্ণ থাকে। খিলাফত রাষ্ট্র, উৎপাদক এবং ভোক্তার স্বার্থ সংরক্ষণে পরিবহন ও বাজারজাতকরণ অবকাঠামো তদারকি করে যাতে উৎপাদনকারী ও ভোক্তার মধ্যে কোনো শোষণমূলক মধ্যস্বত্বভোগী গোষ্ঠী দেয়াল হয়ে দাঁড়াতে না পারে। এর প্রমাণ পাওয়া যায় রাসূল (সা) এর জীবনীতে। রাসূলুল্লাহ (সা) মদিনায় হিজরত করার পর মুসলিমদের জন্য একটি স্বতন্ত্র বাজার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যেখানে কোনো প্রবেশমূল্য বা কর ছিল না। এটি ছিল উৎপাদকদের জন্য সরাসরি বাজারে প্রবেশের একটি বড় সুযোগ। পরবর্তীতে খিলাফত আমলে ‘আল-হিসবাহ’ নামক একটি স্বতন্ত্র বিভাগ তৈরি করা হয়। ‘মুহতাসিব’ (বাজার পরিদর্শক) বাজারে ঘুরে দেখতেন যাতে কেউ পণ্য মজুদ করে (এহতিকার) দাম না বাড়ায় এবং মধ্যস্বত্বভোগীরা যাতে শহরের বাইরে গিয়ে কাফেলা আটকে সস্তায় পণ্য কিনে নিতে না পারে।
- মোঃ জাফর আহমেদ
