খবর:
আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে সচিবালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম এই সিদ্ধান্ত জানান। সড়ক পরিবহনমন্ত্রী বলেন, ‘জনস্বার্থ বিবেচনা করে সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরে প্রতি ভাড়া কিলোমিটারে ১১ পয়সা বাড়বে। আন্তঃজেলায় ৫২ সিটের গাড়ির ভাড়াও প্রতি কিলোমিটারে ১১ পয়সা বাড়বে। এছাড়া ডিটিসি এবং মিনিবাসের ভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ১১ পয়সা বাড়িয়ে সমন্বয় করার সিদ্ধান্ত আমরা নিয়েছি।’ তিনি বলেন, ‘আন্তর্জাতিক সংকট সৃষ্টি হওয়ার পর সরকার প্রায় দেড় মাসের মতো চেষ্টা করেছে জ্বালানি তেলের দাম না বাড়াতে। পরবর্তীতে ন্যূনতম রেটে এটা বাড়ানো হয়েছে। প্রতি লিটারে ১৫ টাকার মতো। যার ফলে পরিবহন খাতে ভাড়া বাড়ানোর একটা দাবি উত্থাপিত হয়েছে। সেটা নিয়ে আমরা আলোচনা করেছি।’ (https://bangla.thedailystar.net/news/bangladesh/news-3918791)
মন্তব্য:
আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে যে, তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে বাস মালিকেরা ক্ষতি পুষিয়ে নেয়ার জন্যে সরকারের সাথে দর-কষাকষি করে বাসের ভাড়া বৃদ্ধি করে নিয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে পরিবহন খাতে যেকোন উছিলাতেই ভাড়া বৃদ্ধির তোড়জোড় শুরু হয়। যেমন, ঈদের সময় তেলের মূল্য বৃদ্ধি না পেলেও বাসের ভাড়া বৃদ্ধি পায়। কিংবা যখন তেলের মূল্য হ্রাস পায় তখন কিন্তু আমরা বাসের ভাড়া কমতে দেখি না! অর্থাৎ বাসের ভাড়া বৃদ্ধির ব্যাপারটি সম্পূর্ণভাবেই পরিবহন মালিকদের কিংবা তাদের সমিতির সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর করে। সরকার শুধুমাত্র এই সিদ্ধান্তের অনুমোদন দেয়। উপরন্তু, পরিবহনের সাথে যুক্ত ব্যক্তিরা রাজনীতির সাথে যুক্ত হয়ে পরিবহণের সাথে সংযুক্ত মন্ত্রণালয় কিংবা অন্যান্য সরকারী অফিসে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়। ফলে, পরিবহন খাতের নীতি নির্ধারনী ব্যাপারে পরিবহন মালিকদের মতামতই প্রাধান্য পায়। যেমন সাবেক আওয়ামী মন্ত্রী শাহজাহান খান বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতিও ছিলেন। তার সময়ে পরিবহন খাত ছিল চরম বেপরোয়া। ফলে, এই ক্ষমতায়নের ফলাফল হিসেবে আমরা দেখতে পাই পরিবহন খাতে একঝাক রাজনীতিবিদ ও পরিবহন মালিকদের যৌথ বন্দোবস্ত। এই যৌথ বন্দোবস্তের মূল বিষয় হচ্ছে পরিবহন খাতকে সরকারী নিয়ন্ত্রণ থেকে বের করে এনে সম্পূর্নরুপে বেসরকারী খাতে ছেড়ে দেয়া। ফলে, শ্যামলী, এনা, হানিফ, সোহাগ ইত্যাদি বেসরকারী পরিবহনে কোম্পানীর বাসে রাজপথ সয়লাব হয়ে গেলেও সরকারী প্রতিষ্ঠান বিআরটিসি’র বাস আমরা কদাচিৎ দেখি। বাস্তবতা হচ্ছে দেশে মোট বাসের ৯৫% বেসরকারী মালিকানার এবং ৫% সরকারী মালিকানার। নৌপরিবহনের চিত্রও একইরকমের। অর্থাৎ বাংলাদেশের পরিবহন ব্যবস্থা বেসরকারী খাতের কাছে নির্ভরশীল এবং জিম্মি। ফলে, বেসরকারী পরিবহন খাত যেকোন মূহুর্তেই জনগণকে জিম্মি করে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করতে পারে।
এই চিত্র শুধুমাত্র পরিবহন খাতেই নয় বরং শিক্ষা ও স্বাস্থ্যর মত সেবা খাতেও আমরা বেসরকারি সেক্টরের প্রভাব দেখতে পাই। বেসরকারী খাতে গুরুত্বপূর্ন সেক্টর ছেড়ে দেয়া মূলত এই পুঁজিবাদী ব্যবস্থারই একটি অন্তর্নিহিত বৈশিষ্ট্য। ফলে, ক্ষুদ্র পুঁজিপতি-গোষ্ঠী আর্থিকভাবে ব্যাপক লাভবান হলেও সাধারণ জনগণ এসকল সেবা গ্রহণ করে উচ্চমূল্যে। আমরা দেখি সরকারী হাসপাতালে চিকিৎসা হয় না আর সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা হয় না। ভাল চিকিৎসা পেতে হলে ছুটতে হয় এভারকেয়ার বা স্কয়ারে আর ভাল পড়তে হলে যেতে হয় ব্র্যাক বা এনএসইউ-তে।
প্রাইভেট সেক্টরের এই দৌরাত্ম্য থেকে মুক্তি পেতে হলে পরিবহণ খাতের মত গুরুত্বপূর্ণ খাতকে অবশ্যই সরকারী ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে হবে। সেটা এই পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় সম্ভব নয় কারণ বেসরকারীকরনই এই ব্যবস্থার অন্তর্নিহিত বৈশিষ্ট্য। এখানে ইসলামী ব্যবস্থার নীতি প্রণয়নের মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব। যেহেতু পরিবহণ একটি জনগুরুত্বপূর্ণ খাত সেহেতু এটিকে প্রাইভেট সেক্টর নির্ভর করা ইসলামে নিষিদ্ধ। রাষ্ট্র সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে জনগণের যাতায়াতকে সুগম করতে। সেক্ষেত্রে রেল সংযোগ বৃদ্ধি করা হবে স্বাভাবিকভাবেই। সারা দেশকে রেল নেটওয়ার্কে সংযুক্ত করা হবে। এর ফলে বাসের উপর নির্ভরতা কমবে। রেলের পাশাপাশি ইসলামি রাষ্ট্র অর্থাৎ খিলাফত রাষ্ট্র প্রচুর পরিমানে রাষ্ট্রীয় বাস সার্ভিসের সূচনা করবে। নদীপথেও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় লঞ্চ এবং অন্যান্য নৌপরিবহনের ব্যবস্থা করা হবে। অর্থাৎ পুরো পরিবহন ব্যবস্থা-ই খলিফা নিজের হাতে রাখবেন। ফলে, প্রাইভেট সেক্টরের হাতে পরিবহন খাত জিম্মি হয়ে থাকবে না। তবে যেকোন নাগরিক চাইলেই অনুমতি সাপেক্ষে বাস এর মত পরিবহণের ব্যবসা করতে পারবে। তবে সেক্ষেত্রে তাকে খিলাফত রাষ্ট্রের বিনামুল্যের বা নামমাত্র মূল্যের পরিবহন খরচের সাথে পাল্লা দিয়ে ব্যবসা করতে হবে। উপরন্তু, জ্বালানী গণসম্পত্তি হওয়ার কারনে জ্বালানীর মূল্য বৃদ্ধিরও কোন ইস্যু তৈরী হবে না। অর্থাৎ, খিলাফত রাষ্ট্র অন্যান্য চাহিদার মত গণপরিবহনকেও সরকারী ব্যবস্থাপনায় এনে জনগণের জন্য এটিকে সুলভ এবং সুগম করে দিবেন। ফলে, একদিকে যেমন বিনামূল্যে কিংবা নামমাত্র ভাড়া গুনতে হবে জনগণকে অপরদিকে কথায় কথায় ভাড়া বাড়ানোর যে সংস্কৃতি তৈরী হয়েছে তা থেকেও মুক্তি মিলবে।
- মো. হাফিজুর রহমান
