সন্তানেরা যুগ্মসচিব-বুয়েট শিক্ষক, তবুও একা ঘরে মরতে হলো বৃদ্ধ মাকে



খবর:

রাজধানীর মিরপুরে একটি ফ্ল্যাট থেকে নুরজাহান বেগম (৭৫) নামে এক বৃদ্ধার পচাগলা লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। ফ্ল্যাটের পরিবেশ ও পরিস্থিতি দেখে বৃদ্ধার শেষ জীবন চরম অবহেলা ও অযত্নে কেটেছে বলে মনে করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, নুরজাহান বেগমের সন্তানরা সবাই উচ্চশিক্ষিত ও সমাজে প্রতিষ্ঠিত। তার ৩ ছেলে ও ১ মেয়ে । বড় ছেলে আনিসুর রহমান খুলনা সমুদ্র বন্দরের যুগ্ম সচিব, মেজো ছেলে আশিকুর রহমান বুয়েটের শিক্ষক ও ছোট ছেলে আতিকুর রহমান কানাডা প্রবাসি। তার মেয়ের নাম ফাতিমা নাসরিন সুলতানা। ফাতিমার স্বামীর নাম গোলাম সাকলাইন সাকি। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের প্রফেসর ছিলেন। (https://www.jugantor.com/capital/1108569)

মন্তব্য:

উচ্চশিক্ষিত এবং সমাজে প্রতিষ্ঠিত সন্তানদের দ্বারা অবহেলিত একজন বৃদ্ধা মায়ের এমন মর্মান্তিক মৃত্যু আমাদেরকে আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, কেবলমাত্র বস্তুগত অগ্রগতি একটি ভারসাম্য ও শান্তি পূর্ণ সমাজ প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ। জীবন থেকে ধর্মকে বিচ্ছিন্ন করা পশ্চিমা ধর্মনিরপেক্ষ জীবনাদর্শ- আধ্যাত্মিক, নৈতিক, মানবিক মূল্যবোধের মতো মানবজীবনের অত্যাবশ্যকীয় মূল্যবোধগুলোর উপর একতরফাভাবে বস্তুগত প্রাপ্তিকে স্থান দিয়েছে। ফলে, অর্থ, সম্পদ, ক্যারিয়ার, ক্ষমতা, মুনাফা অন্বেষণ ও মুনাফার সর্বাধিকীকরণের মত বস্তুগত সাধনায় মানুষ নিমজ্জিত হচ্ছে এবং এগুলোকেই জীবনের একমাত্র সাফল্য হিসেবে দেখছে। আর, স্রষ্টাবিবর্জিত এই পশ্চিমা ধর্মনিরপেক্ষ জীবনাদর্শে পরকালের জবাবদিহিতার ধারণা অনুপস্থিত থাকায় বস্তুগত অর্জনের আড়ালে সমাজে এক চরম শূন্যতা সৃষ্টি হয়, যেখানে আধ্যাত্মিক (Spiritual), নৈতিক (Moral), ও মানবিক (Humanitarian) মূল্যবোধগুলোর গভীর সংকট তৈরি হয়। এর ফলে মানুষ দায়িত্বহীন, স্বার্থপর ও অমানবিক হয়ে ওঠে এবং পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্ক দুর্বল হয়ে পড়ে। পরিবার গঠন, সন্তান প্রতিপালন ও বয়স্ক পিতামাতার যত্ন নেওয়ার মতো মৌলিক মানবিক দায়িত্বগুলো অবহেলিত হচ্ছে এবং বোঁঝা হয়ে দাড়াচ্ছে। শুধুমাত্র বস্তুগত মূল্যবোধের (Materialistic values)  চর্চা এভাবেই সমাজে মানবিকতা ও নৈতিকতার অবক্ষয় ঘটায় এবং সমাজে এ ধরনের হৃদয়বিদারক ঘটনার জন্ম দেয়।

অন্যদিকে, ইসলামী জীবনাদর্শের মূল দর্শন হল বস্তুর সাথে আধ্যাত্বিকতার সংমিশ্রণ (Mixing Matter with the Spirit) অর্থ্যাৎ, কাজ করার সময়ে আল্লাহ্‌’র সাথে সম্পর্ক তৈরী করা। এভাবে মানুষের কার্যাবলী আহ্‌কাম শরীয়াহ্‌ (আল্লাহ্‌’র আদেশ ও নিষেধ) অনুযায়ী পরিচালিত হয় এবং এটিই জীবনের ভিত্তি হিসাবে কাজ করে। আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা’র নির্দেশ অনুসারে নামায-রোজার মত ইবাদতের মাধ্যমে যেমন আধ্যাত্মিক মূল্যবোধ (Spiritual Value) অর্জন হয়, তেমনি শরীয়াহ্‌’র বিধান মেনে অর্থ, সম্পদ কিংবা বস্তুগত সাফল্য অর্জনের মাধ্যমে বস্তুগত  মূল্যবোধ (Materialistic Value) অর্জিত হয়। আল্লাহ্‌’র আদেশ-নিষেধের অংশ হিসেবে একজন ব্যক্তি সামাজিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সততা ও বিশ্বস্ততা বজায় রাখে এবং এর ফলে নৈতিক মূল্যবোধ (Moral Value) অর্জিত হয়। ইসলাম আল্লাহ্‌’র নির্দেশ অনুযায়ী পরিবার গঠন, জীবনসঙ্গীর সাথে সাহচর্য গড়ে তোলা, সন্তান লালনপালন ও বয়স্ক পিতামাতার যত্ন নেয়ার আদেশ দেয় - যার মাধ্যমে মানবিক মূল্যবোধ (Humanitarian Value) অর্জিত হয়। এভাবে, আল্লাহ্‌’র আদেশ-নিষেধ অনুসরণের মাধ্যমে মানবজীবনের অত্যাবশ্যকীয় মূল্যবোধগুলো রক্ষা পায় এবং একটি ভারসাম্যপূর্ণ সমাজ গড়ে উঠে। তাই, ইসলামী জীবনাদর্শ দ্বারা পরিচালিত সমাজে সন্তানরা কখনোই পিতামাতাকে বোঝা হিসেবে গণ্য করে না, বরং তাদের যত্ন নেয়াকে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা’র নৈকট্য অর্জন ও সন্তুষ্টি লাভের একটি সুযোগ হিসেবে দেখে।

    -    কাজী তাহসিন রশীদ

Previous Post Next Post