খবর:
মিরপুরে ৭৫ বছর বয়সী নূর জাহান বেগমের মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। তিনি তাঁর মেয়ের সঙ্গে যে বাসায় থাকতেন, সেই বাসার ভিডিও ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। তাতে দেখা যাচ্ছে, নূর জাহান বেগমের ঘরসহ পুরো ফ্ল্যাটের অবস্থা অত্যন্ত নোংরা, অস্বাস্থ্যকর। মরদেহের ফুটেজেও নূর জাহান বেগমের ডান চোখে সাদা ফাঙ্গাসের মতো পড়ে ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। পল্লবী থানার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও বলছেন, মরদেহ উদ্ধারের সময় তাতে পোকার অস্তিত্ব দেখেছেন।… (https://www.prothomalo.com/bangladesh/capital/nvexikk51b)
মন্তব্য:
আলোচিত খবরটির বিষয়ে নানা পরস্পরবিরোধী বক্তব্য থাকলেও, এটি নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, এই খবরটি আমাদের সমাজের বৃদ্ধ বাবা-মায়েদের বিভীষিকাময় বাস্তবতাগুলোকেই আবারো সামনে নিয়ে এসেছে। এটা উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত কিংবা নিন্মবিত্ত- যে শ্রেণীতেই হোক না কেন! উচ্চবিত্ত বৃদ্ধ বাবা-মায়েরা সাধারনত অবহেলার শিকার হন তাদের সন্তানদের কর্পোরেট ক্যারিয়ার, ব্যবসা কিংবা স্থায়ীভাবে বিদেশে বসবাসজনিত কারণে একাকীত্ব কিংবা নিঃসঙ্গতার দ্বারা। মধ্যবিত্ত প্রবীণরা সাধারনত অবহেলার শিকার হন সন্তানদের কর্তৃক অর্থনৈতিক দায়িত্বহীনতা, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য, সিদ্ধান্ত গ্রহণে উপেক্ষা কিংবা চিকিৎসাহীনতার দ্বারা। আর নিম্নবিত্ত সমাজের সেটা প্রকাশ পায় আরো নিষ্ঠুর ভাবে। এখানে ‘কাজ নেই তো ভাত নেই’ এই ফর্মূলায় বৃদ্ধ পিতা-মাতার সাথে আচরন করা হয়, সরাসরি কোন রাখ ডাক ছাড়াই। এ শ্রেনীতে বৃদ্ধ পিতা-মাতাকে মনে করা হয় একটি দুঃসহ বোঝা! তখন এই নিন্মবিত্ত বৃদ্ধ পিতা-মাতার স্থান হয় রেল স্টেশনে, বাস টার্মিনাল, মাজার কিংবা সরকারি হাসপাতালের বারান্দায়; যে ঘটনাগুলো প্রায়শই আমাদের চোখে পড়ে। সম্প্রতি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক একটি একাডেমিক গবেষণা (যা ইউরোপীয় জার্নাল ও রিসার্চগেটে প্রকাশিত হয়েছে) অনুযায়ী দেশের ৭১.৫ শতাংশ প্রবীণরা তাদের সন্তানদের কর্তৃক অবহেলা শিকার হন। এক্ষেত্রে সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, মাত্র ২.৪ শতাংশ প্রবীণ মনে করেন তারা সন্তানদের কর্তৃক অবহেলা শিকার হন না।
মূলত বৃদ্ধ পিতা-মাতার প্রতি সন্তানদের এর দায়িত্বহীনতার মূল কারণ হচ্ছে, রাষ্ট্র ও সমাজ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত লিবারেল দর্শনের মানসিকতা। এ দর্শনের অন্যতম প্রবক্তা বা রূপকার জন স্টুয়ার্ট মিলের ‘হার্ম প্রিন্সিপাল’ অনুযায়ী ‘একজন মানুষ যা ইচ্ছা তাই করতে পারে, যতক্ষণ না সে অন্য কারো সরাসরি ক্ষতি করছে’। এর ফলে পিতা-মাতার প্রতি দায়িত্ব পালন না করাকে এখানে কোন অপরাধ মনে করা হয় না, বরং অপরাধ মনে করলে সেটিকেই সন্তানের ব্যক্তিগত স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। যদিও বাংলাদেশে এবিষয়ে একটি আইন আছে, যার কোন প্রয়োগ নেই। আর একদিকে লিবারেল দর্শনের প্রচার, অন্যদিকে এর বিরুদ্ধে আইন তৈরি করা হাস্যকর। এই লিভারেল দর্শনে ‘ফ্রিডম’ মানে হল মানুষ সম্পূর্ন স্বাধীন, সে নিজেই নিজের মালিক। এটি মানুষকে শেখায় যে, নিজের ইচ্ছা, ক্যারিয়ার, নিজের আনন্দ ও পছন্দ সবার আগে। এই দার্শনিক মিল তার গুরু জেরেমি ব্যানথামের ‘উপযোগবাদ’ দর্শনকে আরো সংস্কার করেন। এ উপযোগবাদী দর্শনের মূল কথা হচ্ছে, কোন কাজ ভালো কি মন্দ তা নির্ধারণ হবে, সেই কাজের ফলাফল বা উপযোগবাদিতা দেখে। এ অনুযায়ী বৃদ্ধ পিতা-মাতার দেখাশোনা করা যদি সন্তানের জন্য বস্তুগতভাবে লাভজনক হয়, তাহলে এটা তার জন্য ভালো, আর যদি দেখাশোনা করে তার বস্তুগত ক্ষতি হয় বা তার সম্পদ কমে যায়, তাহলে এটা তার জন্য মন্দ।
স্পষ্টতই স্টুয়ার্ট মিলের দর্শন ও তাদের মত পশ্চিমা দার্শনিকদের দৃষ্টিভঙ্গি মানুষকে পরিবার, বৃদ্ধ পিতা-মাতা কিংবা সমাজের প্রতি দায়িত্ব পালন করা শেখাতে সম্পূর্ণ রূপে ব্যর্থ হয়েছে। তাই আমাদের সম্মানিত বৃদ্ধ পিতা-মাতাদেরকে এই বিভীষিকাময় পরিস্থিতি থেকে রেহাই দিতে হলে, আমাদের অবশ্যই এই লিবারেল দর্শনকে সমাজ ও রাষ্ট্র থেকে সমূলে উৎপাটন করতে হবে এবং ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার নিকট জবাবদিহিতার দৃষ্টিভঙ্গিকে সর্বস্তরের প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যা একমাত্র খিলাফত রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই সম্ভব। ইসলাম অনুযায়ী রাষ্ট্র তার শিক্ষাব্যবস্থা, গণমাধ্যম ও অন্যান্য ব্যবস্থাসমূহের দ্বারা এটা প্রতিষ্ঠা করতে বাধ্য যে, পিতা-মাতার দেখাশোনা করাকে সন্তানগণ উপযোগবাদিতা দৃষ্টিভঙ্গি থেকে না দেখে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা কর্তৃক তাঁর নিকট জবাবদিহিতার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখবে। সন্তান যদি অর্থনৈতিক বা অন্য কোনো কারণে অক্ষম হয়, তাহলে রাষ্ট্র অভিভাবক হিসেবে সন্তানদের সক্ষম করে দিবে। আর সেটা না হলে, রাষ্ট্র নিজেই তাদের দায়িত্ব নিয়ে নেবে। তারপরও যদি কেউ বৃদ্ধ পিতা-মাতার অবহেলা করে, তাহলে রাষ্ট্রের বিচার ব্যবস্থা সেটার প্রতিকার করবে।
- মোঃ জহিরুল ইসলাম
